৩ নভেম্বর: অমর্ত্যলোকে যাত্রা

[message type=”custom” width=”100%” start_color=”#FFFCB5″ end_color=”#d9ff80″ border=”#BBBBBB” color=”#333333″]

৩ নভেম্বর: অমর্ত্যলোকে যাত্রা

নভেম্ভর ৩, ২০১৩

Sharmin-ed১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের শোকাবহ এই দিনটিতে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার অভ্যন্তরে, মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী, চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী নিহত হন। ব্যক্তিগতভাবে আমরা সবাই হারাই আমাদের প্রিয়জনদের এবং জাতি হারায় তার স্বর্ণসন্তানদের। নিম্নলিখিত অধ্যায়ে জেল হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটসহ সেই শোকেরই ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতিচারণ তুলে ধরব।

আব্বুর অমর স্মৃতির প্রতি নিবেদিত তাজউদ্দীন আহমদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগে, ২০১১ সালে। প্রতি জুলাইয়ে আব্বুর জন্ম মাসটিতে স্মারক বক্তৃতা, ফিমেল এমপাওয়ারমেন্ট বৃত্তি এবং স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ মার্কসপ্রাপ্ত ছাত্র বা ছাত্রীকে তাজউদ্দীন আহমদ শান্তি স্বর্ণপদক ও মাস্টার্স সমাপ্ত করার জন্য বৃত্তির আয়োজন করা হয়ে থাকে।

ট্রাস্ট ফান্ডটির অনুষ্ঠানের আয়োজন উপলক্ষে আমি এ সময়টিতে আমেরিকা হতে ঢাকায় পাড়ি জমাই। আব্বুর জন্ম মাস, জন্মদিন এই শব্দগুলি ঘিরে কোনো আয়োজনের সময় আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে ভবিষ্যতে। নতুন প্রজন্মের দিকে। তাদের সঙ্গে চিন্তা-ভাবনা বিনিময়ের মাধ্যমে সেতুবন্ধনের সুযোগ আসে। তাদের মধ্য দিয়ে আগামীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করি।

৩ নভেম্বর আব্বুর রক্তঝরা মৃত্যুর দিনটি– ১৯৭৫ সালের বেদনাপূর্ণ নভেম্বর মাসের স্মৃতি, আব্বুর জন্মদিনটিতে ভুলে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু ওই চেষ্টা যেন ক্ষতের উপর ব্যান্ডেজ লাগানোর মতোই। ব্যান্ডেজটা সরে গেলেই উন্মুক্ত হয় সেই স্মৃতি, কিশোরকালের সবচাইতে মর্মান্তিক বেদনার আলেখ্য।

জেলহত্যা দিবস-- ৩

এবার তাই হল, অজান্তে, আকস্মিকভাবে। ট্রাস্ট ফান্ড অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র আমার মামাতো বোন নাসরিনকে দিতে গিয়ে। সে ওর পুরানা চিঠিপত্রের বাক্স গোছাতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছে আমার এক চিঠি। আব্বুর ইহলোকত্যাগের মাত্র ছয় দিন পরে চট্টগ্রামে ওর পিঠোপিঠি বড় বোন ইয়াসমিন এবং ওকে লেখা চিঠি।

আব্বুকে হত্যা করার পরেও আমাদের বাসায় আর্মি–পুলিশের নজরদারি ও হয়রানি এবং আমাদের নিরাপত্তার কারণে আমার বড় মামা ক্যাপ্টেন সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া ঢাকায় রাজাবাজারে, উনার ইন্দিরা রোডের ভাড়াবাড়িতে আমাদেরকে নিয়ে এসেছিলেন। ব্যবসার কারণে তিনি সে সময় ঢাকা ও চট্টগ্রামে যাতায়াত করতেন। চিঠিটা ওই সময় লেখা। এক পনেরো বছরের কিশোরী তার মনের অবস্থা ব্যক্ত করছে তারই সমবয়সী আত্মীয়দের কাছে। সামান্য বিবর্ণ হয়ে আসা নরম কাগজে লিপিবদ্ধ সেই চিঠির মধ্যে আমি ডুবে গেলাম। ভুলে যাওয়া চিঠিখানি পড়লাম নতুন করে। বেদনাসিক্ত সেই সময়ের দুয়ার উন্মোচন করে।

চিঠির উপরে ইংরেজিতে লেখা “মে গড ব্লেস ইউ”। তার নিচে লেখা “ফরগেট মি নট”, ডানে “লাভ” এবং বাঁয়ে “পিস”। চিঠিটি শুরু হয়েছে এভাবে–

“প্রিয় নাসরিন ও ইয়াসমিন, ৯/১১/৭৫

প্রথমেই তোমরা আমার আন্তরিক ভালোবাসা নিও। তোমরা কেমন আছ? আমরা এক রকম ভালো আছি।

আমরা সবাই গত পরশুদিন থেকে তোমাদের বাসায় আছি। ভবিষ্যৎ বলতে আমার দুচোখে যেন কিছু আপাতত নেই। দেশেরই যদি ভবিষ্যৎ না থাকে তবে আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থাৎ দেশের জনগণের ভবিষ্যৎ থাকবে বলে কি আশা করা যায়। আব্বুর কথা তো জান। এ দেশের মাটিতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এটা।

বাংলাদেশ কত নরম-কোমল-সবুজে ভরা একটি ছোট্ট দেশ– কিন্তু সে দেশের মাটির মাঝেই ঘটে যায় কতশত নিষ্ঠুর রক্তাক্ত ঘটনা ও ইতিহাস। তারই পুনরাবৃত্তি ঘটে গেল সেদিন। জান, আব্বু মারা গেছে যখন শুনলাম তখন বিশ্বাস করিনি একটুও। আমার শুধু মনে হচ্ছিল, হতেই পারে না আব্বুর মতো দেবতার মতো মানুষ, তিনি কেন মরতে যাবেন? তাছাড়া আব্বুর তো কতশত কাজ দেশের প্রতি এখনও পড়ে রয়েছে, তবে এমন কেন হতে যাবে!

কিন্ত তারপর যখন কনফার্ম হলাম– তখন ঘরে বসে একলা চিৎকার করে অনেকক্ষণ কাঁদলাম– তারপরেই আমার কান্না যেন সব ফুরিয়ে গেল– একটুও আর কান্না আসেনি। আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে শক্ত হয়ে আছি। কেঁদে তো আর ফিরে পাব না। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে মনে হয় একটু প্রাণভরে কেঁদে মনটা হালকা করে নিই। কিন্তু চোখে কান্না যে আসে না! ক’ রাত ভালোভাবে ঘুম আসে না– আর ঘুম যখন অজান্তেই এসে পড়ে তখন রীতিমতো নাইটমেয়ার দেখি। অথচ কল্পনা কর, আগে আমি কেমন ঘুমকাতুরে ছিলাম! এখন বিছানায় শুই ঠিকই, কিন্তু শান্তির বিছানায় নয়, দুশ্চিন্তার কোলে শুয়ে পড়ি।”

তাজউদ্দিন আহমদ

তাজউদ্দিন আহমদ

আব্বুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ফলে আমি যেন হঠাৎ করেই সত্যিকারের বিচ্ছেদ বেদনা আবিষ্কার করি প্রথমবারের মতো। আমাদের জীবনের অনেকখানিই বদলে যায় রাতারাতি। এমনকি একমাত্র ভাই, সে সময়ের পাঁচ বছরের ছোট্ট সোহেলকেও পরিচিত হতে হয় জীবনের এই নতুন ধারার সঙ্গে। এই আবিষ্কারটি দুঃখজনক হলেও জীবনের পরম পাওয়াও বটে। জীবনের গভীরতম দুঃখবোধই বোধহয় পারে অন্যের গভীরতম বেদনার আরও কাছাকাছি হতে এবং ক্ষণস্থায়ী জীবনের এই বৃত্ত পেরিয়ে অসীম দিগন্তকে খুঁজতে। এই দ্বৈততার নামই হয়তো জীবনের প্যাকেজ ডিল।

আব্বুর হত্যাকাণ্ডের পর আমার জীবনের প্রথম পাওয়া ডায়েরিটিতে আমি উজাড় করে লিখতাম মনের কথা। যে ব্যথা প্রকাশ করতে পারতাম না তা নিভৃতে ব্যক্ত করতাম ডায়েরির পাতায়। লেখার মধ্যে অতি কষ্টদায়ক এই শূন্যতাবোধকে রূপ দিয়ে যে অনেকটা সেলফ থেরাপির কাজ করছিলাম তা সেদিন জানার কথা ছিল না। পরে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গনে শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর লেখাপড়া শুরু করার পর বিষয়টি সমন্ধে জানা হয়।

নব্বই দশকে বসনিয়ায় গণহত্যা বন্ধের আন্দোলনে যখন সরাসরি জড়িয়ে পড়ি, তখন বসনিয়ার শিশু-কিশোর যারা প্রত্যক্ষ করেছে নির্মমতা এবং প্রিয়জনের সহিংস মৃত্যু তাদেরকে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে নানারূপে সহায়তা ছাড়াও, তাদের হাতে আমরা তুলে দিই রঙ-তুলি। শিশু-কিশোররা, যারা বেদনার ভারে কথা বলা প্রায় ভুলে গিয়েছিল, তারা কথা বলা শুরু করে রঙ-তুলির মাধ্যমে।

তো পঁচাত্তরের সেই ডায়েরিটিই হয়ে যায় অনেকটা রঙ-তুলির মতো।

নতুন বছরের শুভেচ্ছাস্বরূপ আব্বু-আম্মার কাছে অনেকেই ক্যালেন্ডার, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক ইত্যাদি পাঠাতেন। সেভাবেই ডায়েরিটি পাওয়া। এই প্রাযুক্তিক ও ভোগবাদী যুগের বিস্ফোরণ তখনও ঘটেনি। নতুন বইয়ের গন্ধ, ডায়েরির মলাটের স্পর্শ, রোজার ঈদের চাঁদ দেখা সবই হৃদয়কে উদ্বেলিত করত নির্মল আনন্দে। নিখরচায় সেই নির্দোষ আনন্দপ্রাপ্তির মূল্য ছিল অমূল্য।

আমি মনের আবেগে সেই ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেছিলাম বসন্তের আগমনী, নীল সাগর, জোসনা ও আব্বু-আম্মার সঙ্গে শ্রাবণের ঝড়ো হাওয়ায় বৃষ্টি দেখার মধুর স্মৃতি। স্মরণ করেছিলাম ১৮ এপ্রিলের দিনটিতে মহান বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে ইংরেজদের সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামের কথা। তখন কে জানত যে এক স্বপ্নপিয়াসী কিশোরী ওই একই ডায়েরিতে ধারণ করবে তার জীবনের সবচেয়ে বেদনার স্মৃতি! মুক্তিযুদ্ধের কাণ্ডারি, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আপোসহীন, নিষ্কলুষ নেতা তাজউদ্দীন আহমদের মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যুকে তাঁর কন্যা গেঁথে রাখবে রক্তাক্ষরে তার জীবনের প্রথম পাওয়া ডায়েরিটিতে।

বুধবার, ৫ নভেম্বর, ১৯৭৫

“আমার জীবনে একি ঘটে গেল? কেন এমন ঘটল? আব্বু আর নেই। এ পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই শুনছিলাম আব্বুকে নাকি রোববার (দিবাগত) রাতে জেলে ঢুকে গুলি করে মেরেছে। আমি বিশ্বাস করিনি, হেসে উড়িয়ে দিয়েছি। ভেবেছি আব্বুকে মারবে কেন? মারবে কেন? হাসান ভাই (আমাদের ভাতৃসম পারিবারিক বন্ধু) ও আমি রিকশায় চড়লাম। আব্বুর খবর শুনলাম। (আম্মা, ছোট বোন রিমি ও আমি সারাদিন ধরে পাগলের মতো ঘুরছিলাম জেলে হত্যাকাণ্ডের গুজবের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য। হত্যাকাণ্ডের পর দুই দিন পর্যন্ত সরকারি প্রশাসন ও মিডিয়া এই বিষয়ে নিস্তব্ধ থাকে)।

আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। বাসায় এলাম। ঘরে গেলাম। চিৎকার করে সবার আড়ালে কাঁদলাম। কাঁদবার পর যেন পথ দেখতে পেলাম। আব্বু যেন হাসছে, বলছে, ‘চিন্তা কোর না, সব ঠিক হয়ে যাবে!’ মনকে শক্ত করলাম। যতক্ষণ লাশ না দেখেছি, বিশ্বাস করতে পারিনি। লাশ এল, দেখলাম। সবার সঙ্গে কাঁদলাম। তারপর থেকে আমার একি হল! আমার চোখে যে জল আসছে না। আমি পাথর হয়ে গেছি। আম্মার দিকে তাকিয়ে মনকে পাষাণ বেঁধেছি। আমরা শুধু আব্বুকে হারাইনি, সারা দেশের একটা সম্পদ হারিয়েছি। অমানুষিক হত্যা! জেলে ঢুকে রাতের বেলা পশুর মতো গুলি করে মেরেছে।

আব্বু তো মরেনি, ঘুমিয়ে আছে সারা পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের অন্তরে। আব্বুর আদর্শ, আব্বুর কাজ, কত মহান লক্ষ্যের দিকে ধাবিত ছিল! দেশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তেই যেন আব্বু দূরে চলে গেল! কে এখন পথ দেখাবে? আর তো কোনো নেতা নেই! আব্বু আমার আব্বু।”

স্বাধীনতা-উত্তরকালের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সেদিনের রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্যদের কাছে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে দেশ যেভাবে চলছে, বঙ্গবন্ধু বাঁচবেন না, ওনাদেরকেও বাঁচিয়ে রাখা হবে না এবং দেশ চলে যাবে গণহত্যাকারী স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাতে। ১৯৭৪ সালের শুরু থেকেই তিনি এ কথা বলা শুরু করছিলেন। প্রখর দূরদর্শী, অপ্রিয় সত্যভাষী ও সৎপরামর্শক তাজউদ্দীন আহমদের সতর্কবাণী ও উপদেশ সেদিন শুধু অগ্রাহ্যই হয়নি, ওনাকেই বরং অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সরে যেতে হয়েছিল।

তাজউদ্দীন আহমদের আশংকা ও ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারবর্গ ও জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে আসন গেড়ে নেয় সুদীর্ঘকালের জন্য। যার অশুভ জের আজও চলছে।

শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসাজশে ১৫ আগস্টে সংঘটিত সামরিক অভ্যুথান ও নভেম্বর মাসের জেলহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল সেই বেসামরিক চক্র যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে সিআইএ-পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছিল এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যাদের ষড়যন্ত্রকে বলিষ্ঠভাবে প্রতিহত করেছিলেন।

প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক প্রয়াত ক্রিস্টোফার হিচিন্স তাঁর সাড়াজাগানো “দা ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার” গ্রন্থে (২০০১) উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস বেসরকারি সংগঠনটি ১৫০ জনের বেশি স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা ও সিআইএ এজেন্টদের সাক্ষাৎকার নেবার মাধ্যমে গণহত্যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হবার বিষয়টি নয়মাসের দীর্ঘ অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানার প্রচেষ্টা নেয়।

রিপোর্টটি জনসমক্ষে প্রকাশ না করা হলেও সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলয সেই রিপোর্ট পড়ার সুযোগ পান। রিপোর্টটিতে ১৯৭১ সালে কিসিঞ্জারের প্ররোচনায় এবং খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিলম্বিত করার উদ্যোগ এবং মোশতাকের ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করার বিষয়টি উল্লিখিত হয়। লিফশুলয তাঁর নিজের সাড়াজাগানো বই “বাংলাদেশ দা আনফিনিশড রেভুলুশন” গ্রন্থেও এ বিষয়ে উল্লেখ করেন যে, নিরঙ্কুশ এবং আপোসহীন স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে তাজউদ্দীন আহমদের শক্ত অবস্থানের কারণেই কিসিঞ্জার গোপনে বেছে নিয়েছিল খন্দকার মোশতাক ও তার অনুসারীদের।

লিফশুলযের তথ্যানুসন্ধানের মাধ্যমে আরও জানা যায় যে, ১৯৭৫ সালে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ইউজিন বোস্টার ওয়াকিবহাল ছিলেন যে মুজিবের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভ্যূত্থান সংগঠিত হতে চলেছে। অভ্যূত্থানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল।

সপরিবারে তাজউদ্দিন আাহমদ

সপরিবারে তাজউদ্দিন আাহমদ

১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের শেষে রাত ১১ টার দিকে, লুঙ্গি-গেঞ্জি পরিহিত তাজউদ্দীন আহমদ কিছু দূর পায়ে হেঁটে ও রিকশায় করে বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়েছিলেন। উনি তখন শোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ, ওনার সোর্স থেকে পাওয়া খবরের উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। তাঁর ওপর যে কোনো সময় হামলা হতে পারে। তিনি যেন অবিলম্বে সেনাবাহিনীর দিকে কড়া নজর দেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর পরম শুভাকাঙক্ষী, বিশ্বস্ত বন্ধু ও সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমদের সতর্কবাণী সেদিন আমলে নেননি।

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পক তদানীন্তন মেজর আবদুর রশীদ ও মেজর ফারুক রহমান, বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও তদানীন্তন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে জুনিয়র আর্মি অফিসারদের অভ্যূত্থানের বিষয়টি অবহিত করে এবং উভয়ের সমর্থন লাভ করে (সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের কাছে দেওয়া টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তারা একথা জানায়, যা এখন সর্বজনবিদিত)।

বেসামরিক এবং সামরিক বাহিনীর যোগসাজশে এভাবেই সংঘটিত হয় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড। অতি বেদনাদায়ক ব্যাপারটি ছিল যে ১৯৭১ এর স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তান-মার্কিন স্বার্থ রক্ষাকারী মোশতাক-তাহেরউদ্দীন ঠাকুর-মাহবুব আলম চাষী এই পরাজিত চক্রটিই স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজনে পরিণত হয়ে নিজ দলের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে থাকে। এরাই ছিল মুজিব-হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী। এরা স্বাধীনতার প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হবে না, উপরন্তু এরা আঘাত হানবে স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী আপোসহীন নেতৃত্বের উপর– সে বিষয়ে তাজউদ্দীন আহমদের কোনো সন্দেহ ছিল না।

এ কারণেই মন্ত্রিসভায় এবং বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে না থাকলেও ১৫ আগস্ট তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। ২২ আগস্ট যখন তাঁকে বাসা থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন আম্মা, বেগম জোহরা তাজউদ্দীন প্রশ্ন করেছিলেন যে কবে তাঁকে ছাড়বে বলে তিনি মনে করেন। আব্বু যেতে যেতেই পেছনে হাত নেড়ে বলেছিলেন, “টেক ইট ফর এভার”। তিনি চিরকালের জন্যই চলে যাচ্ছেন।

এক যুগ পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডেভলপমেন্টাল সাইকোলজির ক্লাসে আমি অধ্যাপক ড. গার্সিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, স্বপ্ন ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে কিনা এবং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কী? তিনি আমাকে বলেছিলেন, প্যারা-সাইকোলজির উপরে প্রকাশিত গবেষণামূলক লেখাগুলি পড়তে যা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অস্তিত্ব সমন্ধে ইঙ্গিত দেয় (সাম্প্রতিক হাজার তথ্য এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, কোনো ঘটনা ঘটার আগেই হৃদয় তা জানতে পারে এবং হৃদয় হতেই সবচেয়ে বেশি ইনফরমেশন সিগন্যালস মস্তিস্কে যায়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক অধিকতর নির্ভরশীল হৃদয়-জ্ঞানের ওপর। সেজন্যই আমরা হয়তো হৃদয় দিয়ে ভালোবাসার কথা বলি, মস্তিস্ক দিয়ে নয়। এ বিষয়ে জানতে আগ্রহীরা ডক চিলড্রে এবং হাওয়ার্ড মার্টিন প্রকাশিত “দা হার্টম্যাথ সল্যুশন” বইটি পড়ে দেখতে পারেন)।

স্বপ্ন যে ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে সেই উত্তর আমার জীবনের বেদনার অভিজ্ঞতা থেকে আমি তার আগেই পেয়ে গেছি। পৃথিবীর বহু মানুষও তা উপলব্ধি করেছেন। আমাদের পবিত্র কোরআনসহ প্রায় সব ধর্মগ্রন্থেও স্বপ্নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎজ্ঞানের কথা উল্লিখিত হয়েছে। প্রশ্নটি করেছিলাম স্বপ্নের মাধ্যমে অতীন্দ্রিয় জ্ঞানলাভ সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলে তা জানার জন্য (আমার এক প্রিয় এবং জগৎখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল ইয়ুং-এর (Carl Jung) স্বপ্ন-অতীন্দ্রিয়-ভবিষ্যৎ জ্ঞান সম্পর্কে গবেষণা মনস্তত্ত্বসহ, জ্ঞানের বহু শাখায় অসাধারণ ও যুগান্তকারী অবদান রেখেছে। তিনি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও অতীন্দ্রিয় জ্ঞানকে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন)।

আব্বুকে জেলে বন্দি করার পরেও আমাদেরকে একমাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। আব্বুর সঙ্গে পুরাতন ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করার অনুমতি মেলে এক মাস পরে। সেপ্টেম্বর মাসে। অক্টোবরে, কারাগারে আব্বুর সঙ্গে আম্মার সাক্ষাৎ হয়। সেদিন তিনি আম্মাকে জানান যে স্বপ্নে তিনি মুজিব কাকুকে (বঙ্গবন্ধুকে আমরা ছেলেবেলা থেকে ওই নামেই সম্বোধন করতাম) বাগানে তার কাছে আসতে দেখেছেন।

পাশাপাশি দুই নেতা, বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন আহমদ

পাশাপাশি দুই নেতা, বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন আহমদ

আব্বু জেলের ভেতরের পচা একটা নর্দমা ভরাট করে নিজেই কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে অতি মনোরম এক মৌসুমি ফুলের বাগান করেছিলেন। স্বপ্নে সেই বাগানে মুজিব কাকু এসে উপস্থিত। আব্বু যেন তখন খুরপি দিয়ে বাগানে কাজ করছেন। মুজিব কাকু আব্বুকে বলছেন, “তাজউদ্দীন, সেই চুয়াল্লিশ সাল থেকেই আমরা একসঙ্গে আছি। এখন আর তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে না। তুমি চলে আস আমার কাছে।“ আব্বু বললেন, “মুজিব ভাই, আমার অনেক কাজ রয়েছে। আমাকে কেন ডাকছেন?” মুজিব কাকু উত্তর দিলেন, “আমাদের আর কোনো কাজ নেই। সব কাজ শেষ।’’

নভেম্বরের ১ তারিখ, শনিবার। আম্মা একটা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলেন। স্বপ্নে দেখেন যে বাঁশের চারটি তাঁবু পাশাপাশি রাখা। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, “কাদের এই তাঁবু?” কে যেন উত্তর দিল, “এই তাঁবুগুলো তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান সাহেবদের জন্য।’’

স্বপ্নের মধ্যেই আম্মার মনে হল যে বাঁশের তাঁবু দেখা তো ভালো নয়। টিফিন ক্যারিয়ার ভরে আব্বুর পছন্দের খাবার রেঁধে সেদিনই আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে আম্মা একাই জেলে গেলেন আব্বুর সঙ্গে দেখা করতে। আম্মা, আইনজীবীদের সহায়তায় হাইকোর্টের মাধ্যমে আব্বুর আটকাদেশকে অবৈধ চ্যালেঞ্জ করে আব্বুকে মুক্ত করার জন্য নথিপত্র জোগাড় করেছিলেন।

হত্যাকারী সেই আর্মি-মোশতাক সরকার আব্বুকে দুর্নীতিতে জড়ানোর নিরন্তর চেষ্টা করেও দুর্নীতি তো দূরের কথা, একটা সাধারণ নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও দাঁড় করাতে পারেনি। আব্বুকে মুক্ত করার জন্য ৫ নভেম্বর আদালতে রিট পিটিশন ওঠার কথা। আম্মা আব্বুকে সেই খবর জানালেন। কিন্তু আব্বু যেন কেমন চিন্তামগ্ন রইলেন। তিনি আম্মার ডাক নাম ধরে বললেন, “লিলি, আজ রাতে ডায়েরির শেষ পাতা লেখা হবে। সেই সঙ্গে শেষ হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা।” তারপর বললেন, ”আর বোধহয় বাঁচব ন।’’ জেলে আব্বুর সঙ্গে আম্মার সেই শেষ সাক্ষাৎ।

৩ নভেম্বর, মাত্র ভোর হওয়া শুরু হয়েছে। আব্বু ও তার সহকর্মীদের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে রয়েছে কারাগৃহের মাটিতে। সেই ভয়াল সংবাদটি আমরা জানতে পারব আরও একদিন পরে। আম্মা সেই একই ভোরে স্বপ্নে দেখলেন যে, বিস্তীর্ণ মহাকাশে বিচরণকারী মধ্য গগনের সূর্যটি যেন আচমকাই অস্তগামী সূর্যের মতো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। সিংহাসনের মতো এক আসনে বসা আব্বুর সারা শরীরের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে রক্তলাল আলো। আব্বুর পরনের সাদা গেঞ্জিটি ক্রমশই লাল হয়ে উঠছে। যেন সূর্য থেকে বের হচ্ছে রক্তের ধারা।

আম্মা স্বপ্নের মধ্যেই ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “মধ্য গগনের সূর্যের রঙ অস্তগামী সূর্যর মতো লালরঙের হয় কী করে?” অদৃশ্য থেকে কে যেন গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল, “দেশের উপর মহাবিপদ নেমে আসছে”। আম্মা এক অজানা আশঙ্কা নিয়ে দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠলেন। সাতসকালে জঙ্গি বিমানের প্রচণ্ড শব্দে আমাদেরও ঘুম ভেঙে গেল। আমাদের বাসার খুব নিচ দিয়ে জঙ্গি বিমান ও হেলিকপ্টার ঘন ঘন উড়ে যেতে দেখলাম।

ঘর থেকে বেরিয়ে আমার নানা আম্মাকে জিজ্ঞেস করলেন, “লিলি, এত প্লেন কেন উড়ছে?” আম্মা বললেন, “অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না। মনে হয় আমাদের বাসা ছাড়তে হবে।”

ইতোমধ্যে সকাল সাতটায় রেডিওর অনুষ্ঠান হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে লিভার সিরোসিস রোগাক্রান্ত আমাদের মেজকাকু (আব্বুর পরবর্তী ভাই প্রয়াত মফিজউদ্দীন আহমদ) চিন্তিত হয়ে ছোট ফুফুর ছেলে ঢাকা কলেজের ছাত্র বাবুলকে (নজরুল ইসলাম খান) আমাদের বাসায় পাঠালেন কোনো খবর আছে কিনা জানতে। বাবুল সকাল আটটার দিকে আমাদের বাসায় পৌঁছে দেখে আম্মা চিন্তিতভাবে ডাইনিং টেবিলের কাছে বসা। বাবুলকে তিনি ভোর রাতে দেখা স্বপ্নটি বললেন।

তারপর অবস্থা ভালো না ঠেকায় আমরা কাছেই ধানমণ্ডির ১৯ নম্বর রোডে মফিজ কাকুর বাসায় আশ্রয় নিলাম। সেদিন ঢাকার রাস্তাঘাট জুড়ে নানা রকম গুজব চলছিল। অনেকেই আম্মাকে বিভিন্ন খবর দিলেন। কেউ বললেন যে, আব্বু ও তার সহকর্মীদের জেল থেকে বের করে বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সরকার গঠনের জন্য। কেউ বললেন, ওনাদেরকে কোনো গোপন জায়গায় নিয়ে সেখান তাদেরকে চাপ দেওয়া হচ্ছে মোশতাকের (অবৈধ) সরকারে যোগ দিতে ইত্যাদি।

আম্মা নিজেও ছুটলেন বিভিন্ন জায়গায় সঠিক খবরের আশায়। তখন তো আর সেল ফোনের যুগ নয়; ফোনও সবার বাড়িতে নেই। নিজেদেরই বিভিন্ন জায়গায় যেতে হচ্ছিল সঠিক সংবাদের আশায়।

পরদিন, ৪ নভেম্বর, মঙ্গলবার, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে খবর এল আব্বুর বন্ধু ডাক্তার এম করিম আম্মার জন্য অপেক্ষা করছেন মফিজ কাকুর বাসার কাছেই, অ্যাডভোকেট মেহেরুননেসা রহমানের বাসার সামনে। ওনার কাছে জরুরি খবর আছে। সংবাদ পাওয়া মাত্রই আম্মা আমাকে নিয়ে রিকশায় চেপে বসলেন। রিকশা থামল বাড়ির সামনে।

আম্মার সামনে দাঁড়ালেন করিম কাকু। ছোটবেলায় অসুখ-বিসুখ হলে আব্বুর এই রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও নিঃস্বার্থ সেবক বন্ধু ড. করিম ছিলেন আমাদের ভরসাস্থল। ওনার সদাহাস্য চেহারা ও মজার মজার আলাপ শুনে অসুখ অর্ধেক ভালো হয়ে যেত। আজ ওনাকে এমন বিমর্ষ, বেদনাসিক্ত কেন লাগছে?

উনি হাউমাউ করে কেঁদে বললেন, “ভাবি, তাজউদ্দীন ও তাঁর সহকর্মীদেরকে আর্মিরা মেরে ফেলেছে।” খবরটি শুনে আম্মা যেন পাথর হয়ে গেলেন। আম্মার হাত আঁকড়ে ধরে আমি বলে উঠলাম, “এ নিশ্চয়ই ভুল খবর!” করিম কাকুর পরিচিত ডাক্তার সেকান্দারের চেম্বার ছিল জেলের কাছেই বকশিবাজারে। তিনি ভোরবেলায় ওনাকে ফোন করে এই মর্মান্তিক খবরটি জানান।

তারপরও বিশ্বাস হতে চায় না। যেহেতু সরকারি তরফ থেকে কিছু বলা হয়নি এবং মিডিয়াও নিরব ভূমিকা পালন করছে, সেহেতু আমাদের পক্ষে ওই হৃদয়বিদারক খবরটি বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। একটা গভীর আতঙ্ক নিয়ে আমরা সারাদিন ছোটাছুটি করলাম সংবাদের আশায়। ততক্ষণে একটা কথা সকলের মুখেই শোনা যাচ্ছিল। গতকাল ভোররাতে জেলে পাগলা ঘণ্টি ও গোলাগুলির শব্দ শোনা গিয়েছে।

বিকেল চারটার দিকে মফিজ কাকুর বাসায় কয়েকজন মহিলা প্রবেশ করলেন। তাদের একজন পরিচয় দিলেন যে তিনি মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের মা। আম্মা তখনও ফেরেননি। তিনি ফুপাতো ভাই বাবুলকে জিজ্ঞেস করলেন, “তাজউদ্দীন সাহেব তোমার কে হয়?” বাবুল জবাব দিল, “মামা হয়”। উনি এবং বাকি মহিলারা বাবুলকে আমাদের থেকে আলাদা করে পাশের ঘরে নিয়ে কী যেন বলেই সঙ্গে সঙ্গে চলে গেলেন।

তাঁরা যেতে না যেতেই ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এল বাবুলের হাহাকারভরা আর্তনাদ। ছোট বোন রিমি ও মিমিসহ ঘরে ঢুকে দেখি বাবুল একবার বিছানায় ও একবার মাটিতে ‘মামা’ ‘মামা’ বলে চিৎকার করে লুটোপুটি খাচ্ছে। খালেদ মোশাররফের মা বাবুলকে দুঃসংবাদটি দিয়ে উনি চলে যাবার পর জানাতে বলেছিলেন।

বঙ্গভবন হতে খন্দকার মোশতাক ও মেজর আবদুর রশীদের নির্দেশে রাতের অন্ধকারে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এই দুজন হত্যাকারীদের জন্য জেল গেট খুলে দিতে আইজিকে হুকুম দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র হতে ঢাকায় এসে জেল হত্যাকাণ্ডের ওপর তথ্য সংগ্রহের সময় ব্রিগেডিয়ার আমিনুল হক, যাকে খালেদ মোশাররফ জেলহত্যার তদন্তে নিয়োগ করেছিলেন, তিনি এই তথ্য আমাকে ১৬ জুন, ১৯৮৭-এর সাক্ষাতে দিয়েছিলেন। পরে তো ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিহত হবার পর এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে জেলহত্যার তদন্ত বন্ধ করে দেয়। বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকারীরা বরং বিদেশের দূতাবাসে পদমর্যাদাযুক্ত চাকরির মাধ্যমে পুরষ্কৃত হয়। মোশতাককে দুর্নীতির দায়ে জেল খাটতে হয়, বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তিকে পাশ কাটিয়ে!

জেলহত্যা দিবস-- ২

সবচেয়ে বড় বেদনা তখনই যখন প্রকাশের সব ভাষা হারিয়ে যায় নিমিষেই। কেমন যেন যন্ত্রচালিতের মতোই রিমিকে নিয়ে ফিরে এলাম আমাদের বাসায়। মনে হল সারাদিন পাওয়া খবরগুলো কোনো অদ্ভূত দুঃস্বপ্ন। জেলে পাগলা ঘণ্টি, গোলাগুলি, আব্বু নিহত!!! এবার হয়তো বাসায় কেউ ভালো খবর নিয়ে আসবেন, এমনি নিভুনিভু আশায় বুক বেঁধে আম্মার পাশে এসে আমরা দাঁড়ালাম।

এক এক করে আম্মাকে ঘিরে মানুষের ভিড় জমে উঠতে থাকল। আম্মা বারান্দার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা। বাকরুদ্ধ। বেদনাক্লিষ্ট। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ময়েজউদ্দীন আহমেদসহ আব্বুর বেশ ক’জন সহকর্মী ও বন্ধু নিয়ে এলেন পাকা খবর। জেলখানায় আব্বু ও তাঁর তিন সহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। সংবাদদাতাদের দিকে আম্মা তাকিয়ে রইলেন কেমন নিস্পন্দ দৃষ্টিতে। আমি সেই মুহূর্তে ছুটে আব্বু ও আম্মার ঘরে ঢুকে ওনাদের খাটে বসে কান্নায় ভেঙে পড়লাম।

কতক্ষণ ওভাবে অশ্রুপ্লাবনে সিক্ত হয়েছিলাম জানি না। পানির ঝাপটায় দুঃখ ধুয়ে যায় না, তারপরও বৃথা আশায় বেসিন খুলে সমানে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিতে থাকলাম। ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখি আম্মাকে ড্রইংরুমের সোফাতে বসানো হয়েছে। এলোমেলো চুলে ঘেরা আম্মার চোখে-মুখে কী নিদারুণ হাহাকার! এক পর্যায়ে আম্মা ডুকরে কেঁদে বললেন, “এই সোনার মানুষটাকে ওরা কীভাবে মারল! দেশ কী হারাল!”

গভীর রাতে, বড় ফুপুর ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শাহিদ ভাইয়ের কাছে জেল কর্তৃপক্ষ আব্বুর মরদেহ হস্তান্তর করে। ৫ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২:২৫ মিনিটে, পুলিশের ট্রাকে করে জেলখানা থেকে চিরনিদ্রায় শায়িত আব্বু ঘরে ফিরলেন। সঙ্গে ফিরল আব্বুর রক্তমাখা ঘড়ি, জামা, স্যান্ডেল ও বুলেটে ছিদ্র হওয়া টিফিন ক্যারিয়ার, যাতে করে ১ নভেম্বর আম্মা শেষ খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন। আব্বুর কোরআন শরীফটি যা তিনি জেলে পাঠ করতেন, তা বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল, সেটা আর ফেরত দেবার অবস্থায় ছিল না।

আব্বুর মহামূল্যবান সেই কালো চামড়ায় সোনালী বর্ডারওয়ালা ডায়েরিটি যাতে তিনি লিখছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কীভাবে চলবে তার দিকনির্দেশনা, সেটা রহস্যজনকভাবে জেলেই হারিয়ে যায় (আব্বুর সঙ্গে অন্যান্যদের মধ্যে বন্দি ছিলেন এ এস এম মহসীন বুলবুল। ১৯৮৭ সালের ৮ জুলাই যখন ওনার টেপে ধারণ করা সাক্ষাৎকারটি নিই, উনি উল্লেখ করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগের এক নেতা কোরবান আলী, যিনি পরে প্রেসিডেন্ট এরশাদের দলে যোগ দেন, তিনি আব্বুর মৃত্যুর পর নিজের কাছে সেই ডায়েরিটি রেখে দিয়েছিলেন এবং লুকিয়ে লুকিয়ে তা পড়তেন। বুলবুল সাহেব আব্বুকে এই ডায়েরিটি লিখতে দেখেছিলেন এবং কৌতূহলবশত ডায়েরিতে কী লিখছেন জিজ্ঞেস করলে আব্বু মাঝে মাঝে ডায়েরিটি থেকে পড়ে শোনাতেন। শনিবার, ১৩ মার্চ, ১৯৭৬ যখন বুলবুল সাহেব জেল থেকে ছাড়া পান, তখন তিনি অনুরোধ করেছিলেন কোরবান আলী যিনি তখনও মুক্তিলাভ করেননি তিনি যেন ডায়েরিটি তাঁর কাছে দেন, যাতে আম্মাকে তিনি এই মহামূল্যবান ঐতিহাসিক ডকুমেন্টটি ফেরত দিতে পারেন। কিন্তু কোরবান আলী ডায়েরিটি ফেরত দেয় না। পরবর্তীতে কোরবান আলীর কাছ থেকে ডায়েরিটি উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও লাভ হয়নি। তার মৃত্যুর পর ডায়েরিটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি)।

আব্বু চিরকালের জন্য মুক্তিলাভ করে ঘরে ফিরে এলেন। ৭৫১, সাত মসজিদ রোডের নিচতলার জলছাদওয়ালা গাড়িবারান্দার পাশের ঘরটিতে আব্বু শুয়ে রয়েছেন। ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর এই ঘরটিতেই মিলিটারি আস্তানা গেড়ে আমাদেরকে গৃহবন্দি করে রাখে। স্বাধীনতা-পূর্বকালে এই ঘরটি আব্বু ব্যবহার করতেন লেখাপড়া, মিটিং ও অফিসের কাজকর্মের জন্য। অসহযোগ আন্দোলনের সময় এই ঘরটিতে বসেই আব্বু দেশপরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ তৈরি করেছিলেন।

শৈশবে এই ঘরটির জানালার পাশে বসে আমি খেলতাম। আব্বু টেবিলে রাখা মর্নিং নিউজ পত্রিকার পাতা থেকে আমার জন্য কার্টুন জমিয়ে রাখতেন। জানালাপথে গাড়িবারান্দার কলাম বেয়ে ওঠা মাধবীলতা ফুলগাছের ঝাড়ে পাখির আনাগোনা দেখে আমি উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠতাম, “আব্বু, পাখি, পাখি!” আব্বু মিষ্টি হেসে বলতেন, “ওই পাখির নাম জান? ওর নাম তিতির।’’ ওই একই ঘরে সেদিন আমরা প্রবেশ করছি। কিন্তু পরিবেশ ও পরিস্থিতি কত ভিন্ন!

৫ নভেম্বর, বুধবার। সূর্য তখনও ওঠেনি। শান্ত ভোর সরব হয়ে উঠেছে অগুণতি মানুষের গুঞ্জরণে। সাত মসজিদ রোডের মাইল খানিক দূর থেকে মানুষের বিশাল লাইন শুরু হয়েছে। শ্রদ্ধাবনতভাবে তাঁরা নিচতলার ঘরটিতে প্রবেশ করছেন। তাঁদের প্রিয় নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে একে একে তাঁরা বেরিয়ে আসছেন। আমি দরজার এক কোণে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছি।

ওই তো দেখা যায় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম দরজার কাছে দাঁড়ানো। চোখে অশ্রু টলমল। ওই দেখা যায় অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে “মামা মামা” (পরিচয়সূত্রে) বলে অঝোরে কেঁদে চলেছেন। ওই যে একসারি মানুষ চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কিছু মানুষ চেনা। অধিকাংশই অচেনা। এনারা কারা? কেন আসছেন? আব্বু কি সত্যি নেই!

ছোট্ট সোহেল কেমন অসহায়ের মতো আব্বুর চারপাশে ঘুরে ঘুরে আব্বুকে দেখছে। মাঝে মাঝে আব্বুর মাথার কাছে বসে থাকছে অনেকক্ষণ ধরে। বিমর্ষভাবে মিমি একবার আম্মার কাছে, আরেকবার আব্বুর কাছে ঘুরাফিরা করছে। রিমি বলল যে, গোসল করানোর সময় সে আব্বুর ডান পায়ের গোড়ালিতে বুলেটের রক্তাক্ত ক্ষত দেখেছে। আমাদের সমবয়সী চাচাতো বোন (মফিজ কাকুর মেয়ে) দীপি দেখল যে, বুলেট আব্বুর গোড়ালির এপাশ ওপাশ ফুঁড়ে বেরিয়েছে।

আমার শক্তি ছিল না সেই দৃশ্য দেখার। আমাদের দরদরিয়া গ্রামের বারেক মিয়া এবং খালাতো ভাই সাঈদ গোসল করাতে গিয়ে আব্বুর শরীরের তিন জায়গায় বুলেটের ক্ষত দেখতে পান। একটি ডান পায়ের গোড়ালির সন্ধিস্থলে, দ্বিতীয়টি উরুতে এবং তৃতীয়টি ছিল নাভি থেকে ছয়-সাত ইঞ্চি দূরত্বে, ডান কোমরের হাড়ের পাশে।

আব্বুর মৃত্যু নিয়ে ভিড়ের মধ্যে কিছু মন্তব্য আমাদের কানে এল। কেউ একজন বললেন যে, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নাকি উল্লেখ করা হয়েছে যে রক্তক্ষরণে আব্বুর মৃত্যু হয়। অন্য কেউ আফসোস করে বললেন, “আহা, জেল কর্তৃপক্ষ যদি সঙ্গে সঙ্গেই তাজউদ্দীন ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন, উনি বেঁচে যেতেন।”

দোতালায় ভেতরের বারান্দায় বসা আম্মার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই আম্মা আমার হাত আঁকড়ে ধরে বললেন, “দেখ, তোমার আব্বুকে বিদায় দিতে আজ কতজন এসেছে।“ জানালাপথে আমগাছের নিচে ট্রাকে শায়িত আব্বুকে ঘিরে থাকা শত শত জনতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে দেশ, যে মানুষ ছাড়া তুমি কিছু বোঝনি আজ দেখ তোমাকে বিদায় দিতে কত মানুষ এসেছে।”

আর্মি-পুলিশ কর্তৃপক্ষের নানা বাধার মধ্য দিয়ে আব্বুর লাগানো আমগাছের নিচেই, বেলা দেড়টার দিকে, রুগ্ন ও শোকাতুর মফিজ কাকু তাঁর পরম ভালোবাসার ‘ভাই সাহেবের’ জানাজা পড়ালেন। আম্মার পাশে দাঁড়িয়ে আমরা দোতলার জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম। জানাজা শেষে আব্বুকে বহনকারী ট্রাকটি আমাদের “যেতে নাহি দেব হায়” কান্না উপেক্ষা করে ধীরে ধীরে বনানী গোরস্তানের দিকে রওয়ানা হল।

ট্রাকের সঙ্গে সোহেলকে কোলে করে চলে গেলেন মফিজ কাকু। তাঁর সঙ্গে গেলেন ছোট কাকু আফসারউদ্দীন আহমদ, শাহিদ ভাই, সাঈদ ভাই, দলিল ভাই, মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান, খালেদ খুররম, আবু মোহাম্মদ খান বাবলু ও আরও দুয়েকজন। আর্মি-পুলিশের বাধায় খুব বেশি লোক সেদিন বনানী গোরস্তানে যেতে পারেননি। যারা সেদিন যেতে পেরেছিলেন তারাই বকুল গাছের নিচে আব্বুকে তাঁর শেষশয্যায় শায়িত করলেন। বড় মামু সোহেলকে ডাকলেন। শিশু সোহেলের হাতে পড়ল তার বাবার কবরের প্রথম মাটি।

আব্বু অমর্ত্যলোকে চলে গেলেন আমাদের হৃদয় শূন্য করে। কিন্তু আসলেই কি চলে গেলেন? যারা অসীম প্রেমময়, সর্বজ্ঞানী স্রষ্টার আরাধনাকে রূপান্তরিত করেন মেহনতি ও নির্যাতিত মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির সংগ্রামে– তাঁরা আশা-আলোর দিশারী হয়ে অমরত্ব লাভ করেন এ জগতেও।

কোস্তারিকা

১ নভেম্বর, ২০১৩



The following comments are on article ৩ নভেম্বর: অমর্ত্যলোকে যাত্রা by Sharmin Ahmad

Link: http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/12903


৮ প্রতিক্রিয়া – “ ৩ নভেম্বর: অমর্ত্যলোকে যাত্রা ”

  1. akhtar hossain on নভেম্ভর ১১, ২০১৩ at ৫:৫৩ পুর্বাহ্ন

    আপনার লেখা পড়লাম। কথাগুলো অনেকে জানে না অথচ জানা প্রয়োজন। ‘আমরা শুধু আব্বুকে হারাইনি, সারা দেশের একটা সম্পদ হারিয়েছি’– আপনার এই কথার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত।

    আমি মনে করি নিজেকে দেখতে হয় অন্যের মাঝে আর সময়কে দেখতে হয় দূর থেকে। তাই আমরা যত বেশি ১৯৭৫ থেকে দূরে যেতে থাকব তত বেশি তাজউদ্দীন আহমেদকে চিনতে পারব।

    ভালো থাকবেন।

  2. Fahad Zitu on নভেম্ভর ৭, ২০১৩ at ৬:৩১ অপরাহ্ণ

    অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জানতে পারলাম। সত্যি এক মর্মান্তিক পরিণতি ছিল। লোভ, ক্ষোভ, দুর্নীতি এগুলাই ছিল এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ। আজকালকার ছেলেমেয়েদের এগুলা জানানো প্রয়োজন যে কত কষ্টে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং এর পিছনে কারা ছিল।

    রিপি আন্টি, আপনি তরুণদের জন্য যা করছেন সত্যি প্রশংসনীয়।

  3. tariq on নভেম্ভর ৪, ২০১৩ at ৭:২৬ অপরাহ্ণ

    মৃত্যু যে কোনো সময়

    প্রত্যেকের জন্যই

    মৃত্যুর পর অনন্ত জীবন …

  4. কাজী আহমদ পারভেজ on নভেম্ভর ৪, ২০১৩ at ১:১১ অপরাহ্ণ

    এটা কেবলই একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা নয়, এটা আসলে জাতির বিবেক-জাগানিয়া এক দলিল।

    এই স্মৃতিচারণা আমাদের যতটা বেদনাসিক্ত করে তার চেয়ে অনেক বেশি করে ক্রোধান্বিত। কতিপয় মানুষ নামের পশুর বিরূদ্ধে এই ক্রোধ জাগিয়ে রাখাটা জরুরি।

    আশা করছি, শারমিন আহমদের মত আরও অনেকে এগিয়ে আসবেন এই কাজটি করার জন্য।

  5. shoaib ahmed on নভেম্ভর ৪, ২০১৩ at ১০:৫০ পুর্বাহ্ন

    পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কর্ণফুলী আর রূপসার স্রোত যতদিন থাকবে ততদিন বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে পরম কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করবে চার জাতীয় নেতা তাজ-নজরুল-মনসুর-কামারুজ্জামানকে। রক্তের এ স্রোত কবে থামবে?

    তবেই একটা অসাম্প্রয়দায়িক গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত দেশ গড়ে আমরা ঋণ শোধ করতে পারব।

  6. Salekin on নভেম্ভর ৪, ২০১৩ at ৬:২২ পুর্বাহ্ন

    তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন স্টেটসম্যান। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের একমাত্র স্টেটসম্যান তিনিই। তিনি আমাদের মহত্তম নেতা। তাঁর নেতৃত্বেই স্বাধীন হয়েছে দেশ। আমাদের স্বাধীনতার পেছনে তাঁকেই প্রধান লোক বলা যায়। কিছু কারণে (জানি না কেন) শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে পারেননি।

    তাজউদ্দিন ছিলেন সৎ, দেশপ্রেমিক এবং আপোসহীন। মুক্তিযুদ্ধের জন্য তাঁর মতো নেতাই দরকার ছিল। আমরা দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধের পর কীভাবে দেশ চলেছে, এখনও কীভাবে চলছে। এটা লজ্জার কথা যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধগুলো এখন বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

    তাজউদ্দিন আহমদের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা। আপনাকে স্যালুট, আমার নেতা!

  7. মোহাং ইলিয়াছুর রহমান on নভেম্ভর ৩, ২০১৩ at ১১:৫৫ পুর্বাহ্ন

    আজ হৃদয়বিদারক ৩ নভেম্বর, নির্মম জেলহত্যা দিবস। জাতি আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে স্বাধীনতাবিরোধীরা, অন্যদিকে স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা। স্বাধীনতাবিরোধীরা আজ একতাবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাঁড়াশি আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে কোনো ঐক্য নেই যা জাতিকে হতাশ করছে।

    আসুন আর কালক্ষেপণ না করে ঐক্যবদ্ধ হই। কেবল ঐক্যই বিজয় নিশ্চিত করবে।

  8. জাহিদ হোসেন on নভেম্ভর ৩, ২০১৩ at ৯:৪৫ পুর্বাহ্ন

    লেখাটি এত ব্যস্ততার মধ্যেও এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম ও কখন যে চোখে পানি চলে এল বুঝতে পারলাম না। এক ম্যনেজারের ‘স্যার’ শব্দে আমি বাস্তবতায় ফিরে এলাম। অন্য দাপ্তরিক কাজে মনোনিবেশের আগে মনে পড়ে গেল পঁচাত্তরের সেই বর্বরতার কথা।

    আমি তখন হাই স্কুলের ছাত্র। বাবা ছিলেন সে সময় আমার স্কুলের ইংলিশ শিক্ষক। বাসায় এসে আম্মাকে বললেন, তাজউদ্দিন সাহেবকেও খুন করা হয়েছে। স্কুলে গিয়ে ছুটি নিয়ে বাসায় এসেছেন। চারিদিকের অবস্থা খুব একটা ভালো না বিধায় আম্মা সেই সময় আমাদেরকে স্কুলে যেতে বারণ করেন।

    তখন রেডিও ছাড়া অন্য কোনো তাজা খবরের মাধ্যম ছিল না। পিরোজপুর শহরে তখন প্রায় অচলাবস্থা। কোনো রকমে যে যার মতো করে বাজার-হাট সেরে বাসায় এসে দেশের অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। তারপর শুরু হল রেডিওর সেই সব মিথ্যাচার যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

    পরের ইতিহাস তো সবাই জানে এবং আমরা দেখেছি কত বড় বড় মিথ্যাচার সত্য হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। মুক্ত হয়েছে মৌলবাদী রাজনীতি। আর এখন আমরা সবাই সেই একই হতাশায় দিন কাটাচ্ছি।

    কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কোনো সঠিক বিচার কখনও পাব কিনা জানি না।

[/message]