সা ক্ষা ত্ কা র – যখন যোগ্য ব্যক্তির সম্মান দেয়ার রীতি প্রচলিত হবে তখন আজকের কীর্তিমানেরাও ভবিষ্যতে সম্মানিত হবেন: শারমিন আহমদ

[message type=”custom” width=”100%” start_color=”#FFFCB5″ end_color=”#d9ff80″ border=”#BBBBBB” color=”#333333″]

সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছেন— রাবেয়া বেবী

 Note:  In the original interview it mentions that Sharmin Ahmad spoke with DIG Prisons Abdul Awal and Jailer Aminur Rahmn but it was Brigd Aminul Huq who interviewed them at the instruction of Brigd Khaled Mosharrar following the jail killings of 3rd november 1975.

১৯৯০ সালে ওয়াশিংটন ডিসির জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেলোশিপ ও উইমেন স্টাডিজ স্কলার্স অ্যাওয়ার্ডসহ উইমেন্স স্টাডিজে মাস্টার্স অব আর্টস ডিগ্রী ও শিশু শিক্ষার ওপরে মাস্টার্স কোর্স সম্পন্ন করেন শারমিন আহমদ। তিনি প্রগতিশীল ইসলামী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিনারেত অব ফ্রিডমের কো-ফাউন্ডার ও সাবেক পরিচালক। তার সম্পাদকীয় চিঠি এবং প্রবন্ধ দ্যা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। আলোচিত বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং বহির্বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাশীল গণমাধ্যমে বক্তব্য রাখেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে পেশাজীবী নারীর বৃহত্তম মানব উন্নয়ন সংগঠন দ্যা স্যারোপটিনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল অব দ্যা আমেরিকান থেকে ‘উম্যান অব ডিস্টিংশন’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। মা জোহরা তাজউদ্দিনের অনুপ্রেরণাতে প্রথম বই লেখেন, বর্তমানে তার তিনটি প্রকাশনা আছে। দুই যুগ ধরে তিনি শিশু ও শান্তি শিক্ষা, ধর্ম ও নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছেন। তার লেখা গ্রন্থ ‘হূদয়ের রঙধনু’ আমেরিকার মনগোমারি কাউন্ট্রিতে উচ্চ মর্যাদাসহ শিশুশিক্ষা পাঠ্যসূচির অনুমোদন লাভ করে। আমাদের কাছে তার বড় পরিচয় তিনি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মহান নেতা তাজউদ্দিন আহমদের বড় মেয়ে। সম্প্রতি দেশে এলে, ‘মহিলা অঙ্গন’র সাথে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসে বাবা-মা, নিজের কাজ আর দেশ নিয়ে ভাবনার কথা। সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছেন— রাবেয়া বেবী

তাজউদ্দিন আহমেদের মূল্যায়ন

একেবারেই হয়নি। যখন যোগ্য সম্মান দেয়ার রীতি প্রচলিত হবে তখন আজকের কীর্তিমানেরাও ভবিষ্যতে সম্মানিত হবেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের অপারগতা অনেকাংশে দায়ী। সমৃদ্ধ ইতিহাস লেখনী এবং রাষ্ট্রযন্ত্র সরকার ও বুদ্ধিজীবীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের কথা জানাতে। বঙ্গবন্ধু জানতেন তিনি বন্দী থাকলেও তাজউদ্দিন আহমদ দেশকে রক্ষা করেতে পারবেন। কার্যত তাই হয়েছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের কান্ডারীকে কেউ সেভাবে মনে রাখেনি। দেশের জন্য আত্মত্যাগকারীদের সঠিক ইতিহাস রচিত হলে পরের প্রজন্ম তাদের রোল মডেল ভাবার সুযোগ পায় এবং তাদের দেশের প্রতি দায়বোধ জন্মে। নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে আমরা কিছু করার চেষ্টা করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পিস এন্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট স্নাতক শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকারকারীকে তাজউদ্দিন আহমদ স্বর্ণপদক ও ছাত্রীকে ‘উইমেন ইমপাওয়ারমেন্ট’ শিক্ষাবৃত্তি দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর জীবন আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতা ও এশিয়াটিক সোসাইটিতে স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়েছে। রিমি বাবার ওপর প্রকাশনাসহ পাঠচক্র করছে।

আমার ‘৭১

আমি তখন কিশোরী বলা যায়। বাবা দেশের হয়ে কাজ করেছেন, বাড়িতে অন্যদের আসা-যাওয়া এবং নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা, সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবাকে মা সংসারের কোন বিষয়ে বিরক্ত করতেন না। মা ২২ কি ২৩ মার্চ আমাকে আর রিমিকে তাঁতিবাজার খালার বাসায় পাঠিয়ে দেন। পাকিস্তানিদের হার্ড লাইন প্রস্তুতি সকলে আঁচ করতে পারছিল, কিন্তু এতটা হার্ড হবে তা বোধ করতে পারিনি আমরা। আমি আর রিমি (সিমিন হোসেন রিমি) ঐ বাড়ির ছাদে ঘুড়ি উড়িয়েছি। সূতা মাঞ্জা দিয়েছি আর ছাদের দেয়ালে নৌকা এঁকে জয় বাংলা লিখে ভরে ফেলেছি। আমার খালু নিরাপত্তার জন্য আমাদের বাবার কথা কাউকে বলতে বারণ করেন। আর ওসব লেখা-আঁঁকা মুছে ফেলেন। কিন্তু আমি মেনে নিতে পারি না। বলেছিলাম বাবার নাম বলেই মরবো। ২৫ মার্চ রাতে চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। অনেক মানুষ এসে আমার খালার বাসায় আশ্রয় নেয়। এরই মধ্যে বাবা চলে যান সীমান্ত পেরিয়ে। আমাদের বাড়িতেও পাকসেনারা হানা দেয়। মায়ের উপস্থিত বুদ্ধির জন্য সেদিন মা, ছোট ভাই-বোন বেঁচে যান। কিছুদিনের মধ্যে মাও আমাদের নিয়ে সীমান্ত পারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। কি রোমাঞ্চকর সেই যাত্রা। আমরা যেখানেই যাই সেখানেই পাকসেনারা পৌঁছে যায়। গ্রামের পর গ্রাম হেঁটে, কখনো পাকসেনাদের চোখ ফাঁকি দেয়ার জন্য ডোবা-ধান ক্ষেতের জলে মুখ গুঁজে এগিয়ে যাওয়া। সেদিনের এই আবহ বলে দেয় আমার একাত্তর কত মর্মস্পর্শী ছিল। যে কোন মুহূর্তে ধরা পরলেই এই দেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারীর পরিবার হিসেবে আমাদের হত্যা করার ঘটনাই ছিল স্বাভাবিক। আর বেঁচে যাওয়াটা নিতান্তই ভাগ্য।

আমার বাবা

আমার বাবা তাজউদ্দিন আহমদ কখনো আমাদের কোন উপদেশ দিতেন না। তিনি নিজেই আমাদের জন্য বড় আদর্শ ছিলেন। নিজ হাতে কাপড় ধোয়াসহ নিজের সব কাজ করতেন। কোনদিন বাবাকে দেখিনি কারো কাছে এক গ্লাস পানি চাইতে। রাজনৈতিক ডামাঢোলের মধ্যেও তিনি বাগান করতেন। লন্ড্রি থেকে কাপড় মুড়ে দেয়া কাগজ কেটে আমাদের রাফখাতা তৈরি করতেন। মনে পরে ১৯৭০ সালে ১২ নভেম্বর যখন প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয় তখন আমাদের বাড়িতে অনেক লোক আশ্রয় নিয়েছিল। ঝড় শেষে বাড়ির আঙ্গিনায় বাবার আর এক রূপ আবিষ্কার করি। আমাদের গাছের বুলবুলি পাখির বাসার জন্য তিনি চোখের জল ফেলেছেন। তখন বাবা বলছিলেন ওদের ঘরে নিলে ওরাও বেঁচে যেত। পাঁচ বছরের সোহেল একদিন মাছ খেতে চাইছিল না। মা ওকে একটা ডিম ভেজে দিতে চাইলে বাবা বারণ করেন। আর গম্ভীর হয়ে বলেন, দেশের মানুষ ভাত পায় না আর তুমি মাছ খাবে না। ট্র্যাকডাউনের পর আমরা সব চড়াই-উতরাই শেষ করে কলকাতায় ডেপুটি হাই কমিশনার হোসেন আলী সাহেবের বাসায় বাবাকে দেখলাম। বাবা কেমন আছি না জানতে চেয়ে প্রথম জিজ্ঞেস করেন দেশের অবস্থা কি? মুক্তিযোদ্ধারা কি করছে? আমি তখন আমার নিজের মধ্যেই দেশের প্রতিনিধিত্ব অনুভব করি। দায়িত্বশীলের মতো বাবাকে দেশের খবরাখবর দেই। সেদিন কয়েক মিনিটের জন্য বাবা আমাদের সাথে দেখা করেন। মাকে শুধু বলেন, দেশের মানুষকে বিপর্যয়ের মধ্যে রেখে আমরা পারিবারিক জীবন-যাপন না করার প্রতিজ্ঞা করেছি। কারণ পরিবার ছেড়েই মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করছে। আরও বলেন, সরকারি অফিসারের বাসায় বেশিদিন না থাকতে।

আমার মা

মা আমাকে সাত মাসের পেটে নিয়ে একটি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। তাই বোঝাই যায় মা আর দশটা সাধারণ বাঙালি নারীর মতো নন। অনেক নারী স্বামীর কাজের অনুপ্রেরণা হন। কিন্তু আমার মা শুধু অনুপ্রেরণাই নন স্বামীকে দায়িত্ব পালন করতেই হবে এমন মনোভাব নিয়ে বাবার কাজকে সহজ করেছেন। ১৯৫৯ সাল, ২৬ এপ্রিল তিনি বেলিফুলের মালা দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করে বাবাকে গয়না দেয়ার দায়মুক্ত করে বিয়েতে গয়না দেয়ার সামাজিক প্রথা উপেক্ষা করেন। ২৫ মার্চ যখন পাকসেনারা আমাদের বাড়িতে আসে, শুনেছি মা তখন আমাদের ভাড়াটিয়াদের পাকসেনাদের সামনেই বলেন, কেতনাবার বোলা থা তাজউদ্দিনকা মাকান কেরায়া মাতল, আব দেখ ক্যা হুয়া। স্বাধীনতার ও বাবার হত্যার পর আমাদের দৈন্যদশা মা একইভাবে অতিক্রম করেন। মায়ের জন্যই আমাদের কখনো বিলাসিতার জন্য আক্ষেপ ছিল না। শুধু নিজেদের পরিবার নয়, সকল পরিবারের জন্য মা নীরবে কাজ করে যেতেন। ১৯৯৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর এক সাক্ষাত্কারে মা বলছিলেন যখন ২ মাস পর কলকাতায় স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়। ভেবেছিলাম কিভাবে এসে পৌঁছালাম তার আদ্যপ্রান্ত বর্ণনা করবো। স্বামী তখন ৫/৬ মিনিট সময়ে পারিবারিক জীবন-যাপন না করার সিদ্ধান্ত জানান। তার কাজের ব্যস্ততায় কোন কথা হল না। চোখের ভাষায় বললাম তুমি ঠিক, স্বাধীন দেশে কথা হবে। মায়ের জন্যই আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়।

জেল হত্যা

আমি ১৯৮৭ সালে দেশে ফিরে দেখলাম জেলহত্যা সম্পর্কে কোন গবেষণাপত্র নেই। মানুষের আগ্রহ নেই। দেশের স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী ৪ নেতার এমন মৃত্যু, অথচ ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য কোন ইতিহাস থাকবে না। এই কি তাদের প্রাপ্য। আমি জানতে শুরু করি ব্রিগেডিয়ার আমিনুল হকের (বীর উত্তম) কাছ থেকে। খালেদ মোশাররফের নির্দেশমতো ডিআইজি প্রিজন আব্দুল আউয়াল ও জেলার আমিনুর রহমানের সাথে কথা বলেছি। তারা দু’জনেই এ ঘটনা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। এই বিষয়ে আমি আরও কথা বলি জেলহত্যা তদন্ত কমিশনের সদস্য বিচারপতি কে এম সোবহান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ, এএসএম মহসিন বুলবুল। শেষের দু’জন তখন জেলে ছিলেন। স্বৈরশাসনের সে সময় কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশিদ দেশে দল গঠন করছিলেন। তাই ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায়নি। প্রতিবন্ধকতা ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত আমার কাজটি সম্ভব হয়। আবদুস সামাদ আজাদ সাহেবের সাক্ষাত্কার বর্তমানে জনকণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। যে কোন লক্ষ্যে সত্ ও অবিচল থাকলে আল্লাহ সাহায্য করেন।

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট

আমাদের দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। যার সিংহভাগ প্রাইভেট সেক্টরের সাফল্য। যে নারীরা সংসারের চাকা ঘোরাতে গিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরায় তাদের দেখলে আমার গর্ব হয়। তবে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থির পরিস্থিতি এই অর্জনকে ভূলুণ্ঠিত করবে। আমার মনে হয় আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের শান্তি ও সংঘর্ষের উপর শিক্ষা নিয়ে শপথ নিয়ে আসা উচিত। আমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারিনি।

এজন্য করণীয়

নতুন প্রজন্মকে দেশাত্মবোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এর জন্য মানসিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে জন্মের পূর্ব থেকে প্রিনেটাল শিক্ষা যেমন দিতে হবে, তেমন শান্তি ও সংঘর্ষ বিষয় শিক্ষা দিয়ে তাদের সংবেদনশীল মানস গঠন করতে হবে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রদেশ মনগোমারী কাউন্ট্রিতে গত ত্রিশ বছর বাস করেছি এবং শিক্ষকতাও করেছি। আমি দেখেছি যেখানে শিশুদের সংবেদনশীল মানুষ করার জন্য শান্তি ও সংঘর্ষ শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। আজকের শিশু যত বেশি সংবেদনশীল হবে ভবিষ্যত্ রাজনীতিও তত সংবেদনশীল হবে। স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত করা— যা হয়নি। প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাতে একটি প্রান্তিক মানুষ মেধা ও যোগ্যতার বলে শীর্ষস্থানে উঠে আসতে পারে। তবেই মেধা ও সততার চর্চা হবে। ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। জঙ্গিবাদ ধর্ম নয়। ধর্ম বিবেক মানবিকতাকে জাগ্রত করে। মহানবী (সা.) মানুষের কথা বলেছেন। সব ধর্মের মূল কথাও তাই। সমাজের সর্বস্তরে প্রেম ও জ্ঞানের চর্চা অব্যাহত রাখা।

ছবি: সাইফুল ইসলাম

( লেখাটি পড়া হয়েছে ৫৫৮ বার )

[/message]