সত্যের সংগ্রাম

[message type=”custom” width=”100%” start_color=”#FFFCB5″ end_color=”#d9ff80″ border=”#BBBBBB” color=”#333333″]

ডিসেম্বর ২৯, ২০১৩

শারমিন আহমদঢাকা কলেজের আরবীর অধ্যাপক সৈয়দ সেরাজুল হকের প্রিয় ছাত্র ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। আরবী ভাষাসহ সব বিষয়ে সেরা ছাত্র হওয়ার জন্যই নয়, তিনি এই মিতভাষী ছাত্রটিকে অশেষ স্নেহ করতেন তার চারিত্রিক গুণাবলীর জন্যও। ন্যায়পরায়ণতা ও সততা ছিল এই ছাত্রটির মধ্যে লক্ষ্য করার মতো বৈশিষ্ট্য।

একদিন এই ছাত্রটিই হবেন তার জামাতা। তাঁর সর্বকনিষ্ঠ সন্তান সৈয়দা জোহরা খাতুন লিলির সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন। আরও পরে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী রুপে মুক্তিযুদ্ধের হাল ধরবেন এবং তার সেই তিল তিল করে লালিত চারিত্রিক গুণাবলী প্রজ্ঞা, সততা ও ন্যায়ের শিখার আলোকে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে পরিচালনা করে জাতিকে পৌঁছে দেবেন বিজয়ের কূলে। শত ষড়যন্ত্র নির্মূল করে তিনি ছিনিয়ে আনবেন আপসহীন স্বাধীনতা।

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের দিনটিতে তিনি ভাষণে বলেছিলেন–

“আমাদের মানবিক মূল্যবোধ ও আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখে আমরা আবার প্রমাণিত করেছি আমরা তিতুমীর-সূর্য সেনের বংশধর। স্বাধীনতার জন্য আমরা যেমন জীবন দিতে পারি, তেমনি আমাদের দেশ থেকে বিদেশি শত্রুসৈন্যদের চিরতরে হটিয়ে দিতেও আমরা সক্ষম। আমাদের অদম্য সাহস ও মনোবলের কাছে শত্রু যত প্রবলপরাক্রম হোক না কেন, পরাজয় বরণ করতে বাধ্য”।

স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন দুর্জয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে ভয় করতেন ভুট্টো, ইয়াহিয়া ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা প্রণয়নকারী রাও ফরমান আলী। তারা তাজউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচারণা করেছিলেন তার একটি ছিল যে তিনি ভারতীয় হিন্দু, আসল নাম তেজারাম। গৃহবন্দি, আমার নানা, বর্ষীয়ান সেরাজুল হককে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জিজ্ঞেস করেছিল যে তিনি আরবী ও ইসলামশাস্ত্রের পণ্ডিত হয়েও কী করে তাঁর কন্যাকে একজন হিন্দুর সঙ্গে বিয়ে দিলেন। সেরাজুল হক সাহেব মিথ্যা খণ্ডন করলেও পাকিস্তানি সেনারা ছিল ব্রেইনওয়াশড। খুব সুপরিকল্পিতভাবে তাদের মস্তিস্কে ধর্ম ও জাতিবিদ্বেষের বীজ বপন করা হয়েছিল। যখন সত্যের সম্মুখ হতে শত্রু ভয় পায় তখনি সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। জামাতা সমন্ধে গর্বিত সেরাজুল হক বলতেন যে, “তাজউদ্দীনের সর্বোত্তম গুণ হল যে সে সত্য বলতে ভয় পায় না।”

তিনি এ প্রসঙ্গে নবী করিম (স:) বর্ণিত এই হাদিসটি বলতেন–

“সর্বোত্তম জিহাদ হল অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্যি কথা বলা।”

এই হাদিসটি বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও একই ধরনের বর্ণনা আবু দাউদ ও তিরমিজি শরীফেও উল্লিখিত হয়েছে। জিহাদের আক্ষরিক অর্থ হল সংগ্রাম যা আত্মিক এবং চারিত্রিক উন্নয়নের সংগ্রাম হতে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপ্ত। বিপন্ন, অসহায়, নিপীড়িত ও নির্যাতিতকে রক্ষা ও তাদের পক্ষ হয়ে অত্যাচারী-অহংকারী-উদ্ধত ও উৎপীড়ক শাসকের সামনে সত্যি কথা বলার মতো শক্তি ও সাহস খুব কম মানুষেরই থাকে। যারা সাহস করে সত্যি কথা বলেন এবং ন্যায়ের পক্ষে লড়েন তারা অর্জন করেন মনুষ্যত্বের উচ্চ সোপান এবং তাদের স্থান ইতিহাসে লেখা থাকে স্বর্ণাক্ষরে। আমি লেখার এই অংশে তুলে ধরব সেই বিদেশিদের কথা যারা বাংলাদেশের প্রসঙ্গে তাদের সরকারের অন্যায় নীতি এবং পাকিস্তানের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে, গণতন্ত্রর সমর্থক এই দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করেছিল চরম অগণতান্ত্রিক, স্বেচ্ছাচারী ও গণহত্যাকারী পাকিস্তান সামরিকতন্ত্র ও তাদের অত্যাচারের দোসর ইসলাম ধর্মের কলঙ্ক মৌলবাদী দলগুলিকে। নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন কমিউনিজম উৎখাতের নাম করে সন্ধি করেছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী স্বৈরাচারী রাজা-বাদশা, একনায়ক ও সামরিক জান্তাদের সঙ্গে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের প্ররোচনায় ও সমর্থনে লাতিন-আমেরিকা এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে সংঘটিত হয় নারকীয় গণহত্যা যে জন্য হেনরি কিসিঞ্জারের বিচার দাবি করে প্রখ্যাত সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেন্স রচনা করেন সাড়াজাগানো ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ বইটি।

প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী, নির্দয় প্রকৃতির, ধূর্ত এই কূটনীতিক-কৌশলবিদের সামনে তার সমালোচনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস খুব কম মানুষই দেখাতে পেরেছিল। বিশেষত সেই মানুষটি যদি তারই অধীনস্থ হন। ১৯৭১ সালে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের নাম সত্যভাষী, সত্যপ্রিয় ও সত্যসন্ধানী মানুষের হৃদয়ে এবং ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করে তার শাণিত বিবেক হতে উচারিত সত্য ভাষণের জন্য। বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রশাসকের অন্যায়কে তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর চাকুরী এবং কূটনৈতিক ক্যারিয়ারের পরোয়া না করে তিনি ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেট হতে, বিশজন কূটনীতিকের স্বাক্ষরসহ তাঁর ঊর্ধ্বতন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান হেনরি কিসিঞ্জারকে ৬ এপ্রিল, ১৯৭১ একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটন ডিসির, স্টেট ডিপার্টমেন্টে ওই তারবার্তাটি পৌঁছুবার পর আরও নয়জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাতে স্বাক্ষর প্রদান করেন। ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে খ্যাত আর্চার ব্লাডের বার্তাটিকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ইতিহাসের সবচাইতে শক্ত ভাষায় লেখা চিঠি হিসেবে অভিহিত করেন সাংবাদিক হিচেন্স। গণতন্ত্রকে দাবিয়ে পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশের নিরীহ জনসাধারণকে নির্বিচার হত্যার প্রেক্ষিতে তাঁর নিজ দেশ, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নির্লিপ্ত ভূমিকাকে তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি লিখেন–

our government has failed to denounce the suppression of democracy. Our government has failed to denounce atrocities.Our government has failed to take forceful measures to protect its citizens while at the same time bending over backwards to placate the West Pak dominated government and to lessen any deservedly negative international public relations impact against them.our government has evidenced what many will consider moral bankruptcy,ironically at a time when the USSR sent President Yahya Khan a message defending democracy,condemning the arrest of a leader of a democratically-elected majority party,incidentally pro-West,and calling for an end to repressive measures and bloodshed….But we have chosen not to intervene,even morally,on the grounds that the Awami conflict,is purely an internal matter of a sovereign state. Private Americans have expressed disgust.We,as professional civil servants,express our dissent with current policy and fervently hope that our true and lasting interests here can be defined and our policies redirected.

প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং সেক্রেটারি অব স্টেট কিসিঞ্জারের অমানবিক নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় আর্চার ব্লাডকে হারাতে হয় তার কনসাল জেনারেলের পদ। তাকে দ্রুত ওয়াশিংটনে ফিরিয়ে এনে সাধারণ ডেস্ক জবে নিয়োগ দেওয়া হয়। গনহত্যাকারী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে ধন্যবাদ জানিয়ে কিসিঞ্জার চিঠি লিখেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে তার ‘কোমল ও কৌশলপূর্ণ’ আচরণের জন্য।

ঢাকায় আর্চার ব্লাডের স্থলাভিষিক্ত হন হারবার্ট স্পিভাক। অবসরগ্রহণের কাছাকাছি সময়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত এই নতুন কনসাল জেনারেল মুখ খুলবেন না এই ধারণা করেই কিসিঞ্জার তাকে এই পোস্টে নিয়োগ করেন। কিন্তু তার পক্ষেও নিশ্চুপ হয়ে থাকা সম্ভব হয়নি যখন তিনি চাক্ষুষ প্রমাণ পান যে রাতের অন্ধকারে (ডিসেম্বর ৮-৯, ১৯৭১) ঢাকার তৎকালীন তেজগাঁও বিমান বন্দরে ভিআইপিদের ব্যবহারের জন্য মোতায়েন ক্ষুদ্র দুই ইঞ্জিনযুক্ত বিমানকে (Piaggio P-136-L) পাকিস্তান সরকার ব্যবহার করেছে তেজগাঁও বিমান বন্দর হতে মাইলখানেক দূরে অবস্থিত এতিমখানা ও বেসামরিক এলাকায় বোমাবর্ষণের জন্য। ওই বর্বরোচিত বোমা হামলায় কয়েকশত নিরীহ এতিম বালক ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারায়।

এই অমানবিক কাজটি পাকিস্তান সরকার করে ভারতীয় এয়ারফোর্সের ওপর দোষ চাপানোর জন্য। উল্লেখ্য, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জামায়াত-এ-ইসলাম দল রটিয়েছিল যে তার অঙ্গ সংগঠন আলবদর বাহিনী নয়, ভারতীয় বাহিনীই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। পাকিস্তান সরকারও একই রকম চেষ্টা চালিয়েছিল।

এতিমখানায় পাকিস্তান সরকারের নারকীয় বোমাবর্ষণের ঘটনাটি খোদ পাকিস্তানের গণহত্যার সমর্থক রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার দালিলিক প্রমাণাদিসহ অফিসিয়াল চিঠি হতেই প্রথম জানা যায়। মার্কিন সেক্রেটারি উইলিয়াম রজারস ও পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঘনিষ্ঠ দোসর জোসেফ ফারল্যান্ডের কাছে প্রেরিত তারবার্তায় অকাট্য প্রমাণাদিসহ স্পিভাক ঘটনাটি বিশদাকারে জানান। তার চিঠির শিরোনাম ছিল– villainy by Night যা পুলিতজার বিজয়ী সাংবাদিক জ্যাক অ্যান্ডারসন তার বই The Anderson Papers এ উল্লেখ করেন।

স্পিভাকের বিশদ চিঠির অংশবিশেষ উল্লিখিত হল–

United Nations Assistant Secretary General [Paul Marc Henry] and I are convinced on the basis of evidence we both regard as conclusive that bombings of non military areas in Dacca last night (and inferentially bombing of orphanage on night of December 8-9) were carried out by a Pak government plane based at Dacca airport and that the purpose of the attacks was to discredit the Indian airforce…. I strongly urge that the Ambassador Farland and Ambassador Bush( possibly in consultation with Secretary General)make immediate demarche to President Yahya and Pak UN Rep Shahi to confront them with evidence and warn them that any future attempt of this kind will bring about full publicity.

স্পিভাক, আর্চার ব্লাডের মতো তার সহকর্মীদের নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না জানালেও, পাকিস্তানের বর্বরতা যাকে তার সরকার সমর্থন দিচ্ছে সে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকতে পারেননি। তিনি, রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড ও জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জর্জ বুশ সিনিয়রকে (পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি) জোরালো আবেদন জানান যাতে তারা প্রমাণাদি সহকারে পাকিস্তান সরকারের বর্বরোচিত বোমা হামলার ঘটনাটি নিয়ে ইয়াহিয়া খান ও জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহীর মুখোমুখি হন।

বলাবাহুল্য পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থন সে সময় বিন্দুমাত্রও কমেনি। তা সত্ত্বেও সর্ব ক্ষেত্র হতেই যুক্তরাষ্ট্রর বিবেকবান মানুষেরা সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশের সমর্থনে। (বিশ্বজুড়েই সেই যুগটাকে হয়তো বলা যেতে পারে আদর্শবাদের যুগ। বৈষয়িক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে মানবিক দায়িত্বকে প্রাধান্য দেওয়া এবং আন্তরিকভাবেই নিপীড়িতর পক্ষ নিয়ে অত্যাচারের প্রতিবাদ করার মানসিকতা এই আগ্রাসী ভোগবাদের যুগে তেমন করে পরিলক্ষিত হয় না।)

জগদ্বিখ্যাত সেতারবাদক বন্ধু রবিশঙ্করের অনুরোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিশ্বনন্দিত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন আয়োজন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ (১ আগস্ট, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন, নিউ ইয়র্ক) নামের চ্যারিটি কনসার্ট যার মাধ্যমে নিমিষেই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে বিশ্ববাসীর পরিচয় ঘটে। এই কনসার্ট থেকে উপার্জিত আড়াই লাখ ডলার দান করা হয় জাতিসংঘের শিশু তহবিলে– ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে মরণাপন্ন ও রোগাক্রান্ত বাংলাদেশি শিশুদের কল্যাণে। নামিদমি সেলেব্রিটির সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত এই বিশাল কনসার্টটি ছিল পরবর্তীকালের ইথিওপিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি চ্যারিটি কনসার্টের পথিকৃৎ।

কংগ্রেসম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাঘের কংগ্রেসে প্রদত্ত তাঁর গভীর অনুভূতিসম্পন্ন বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টে বলেন–

“সন্ত্রাস সবসময় জনগণকে দাবিয়ে রাখতে পারে না। সন্ত্রাস কখনওই মানুষের বিশ্বস্ততা ও সহানুভূতি জয় করতে পারে না।— সন্ত্রাস যতখানি পাশবিক হবে প্রতিরোধও ততখানি দৃঢ় হবে। পূর্ব পাকিস্তানে আজ সে ধরনেরই যুদ্ধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের সামনে একটা নতুন ভিয়েতনাম ঘটতে যাচ্ছে। পাকিস্তান তার বর্তমান আকারে টিকে থাকতে পারবে না। তার কারণ আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি। আমরা পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি। একটি বেপরোয়া সরকারের বর্বর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদেরকে সংযুক্ত করে আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের মানবতাবাদী, মুক্ত এবং মুক্তিপ্রিয় ভাবমূর্তিকে কলংকিত করছি।” (৩ আগস্ট, ১৯৭১; অনুবাদক- লেখক)

সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি নিজ সরকারকে তীব্র ধিক্কার দেন পাকিস্তানের নৃশংসতা ও গণহত্যায় সহায়তা করার জন্য। তিনি বলেন–

It’s a story of indiscriminate killing, the execution of dissident political leaders and students and thousands of civilians suffering and dying every hour of the day….The situation in East Pakistan should be particularly distressing to Americans, for it is our military hardware–our guns and tanks and aircraft–which is contributing much to the suffering”. (১ এপ্রিল, ১৯৭১)

পাকিস্তানের হামলা হতে বাঁচার জন্য ভারতে আশ্রয় নেয় দশ লক্ষ বাংলাদেশের শরণার্থী। ভারত সরকার তাদের রক্ষার জন্য সীমান্ত খুলে দেয়। ভারতের সাধারণ জনগণ এই বিপন্নদের পাশে এসে দাঁড়ায়। সেই সময় মার্কিন সিনেটের শরণার্থী বিষয়ক সাব কমিটির সভাপতি সিনেটর কেনেডি ভারতে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলি দেখে আসার পর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক সম্মেলনে তাদের নিদারুণ অবস্থার বর্ণনা এবং তার সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন–

I am grateful to the members of the National Press Club and to share my experiences during a week long visit to the refugee camps of India–to a scene which only can be described as the most appalling tide of human misery in modern times….Unfortunately the face of America today in South Asia is not much different from its image over the past years in Southeast Asia. It is the image of an America that supports military repression andfuels military violence.

(জাতীয় প্রেস ক্লাব, ২৬ আগস্ট, ১৯৭১; ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ কংগ্রেসনাল রেকর্ডভুক্ত হয় )

সত্যের জন্য যারা সংগ্রাম করেন তারা দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ দেখেন না। ওই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানও দেখেন না। সত্য বলেন তারা বিবেকের তাগিদে। মানুষ পরিচয়টির সার্থক প্রতিনিধি তারা হন জাগ্রত বিবেকের অনির্বাণ দ্যুতিতে।

তথ্যসূত্র:

১. Christopher Hichens. The Trial of Henry Kissinger. New York: Verso, 2001, p. 45-47

২. Jack Anderson with George Clifford.The Anderson Papers. New York: Ballantine Books, 1974, p 296-299

৩. http://tajuddinahmad.com/friends-of-bangladesh

৪. http://tajuddinahmad.com/us-congressional-records

 

কোস্তারিকা, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৩


The following comments are on article সত্যের সংগ্রাম by Sharmin Ahmad

Link: http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/14182


৬ প্রতিক্রিয়া – “ সত্যের সংগ্রাম ”

  1. amin ahsan on জানুয়ারী ১৭, ২০১৪ at ১১:১৮ অপরাহ্ণ

    চমৎকার একটি লেখা পড়লাম…………

  2. Akhtar Hossain on ডিসেম্বর ৩১, ২০১৩ at ১২:৩১ অপরাহ্ণ

    বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি এতই কলুষিত যে আপনারা টিকতে পারবেন না…

  3. Khandker H. Ahmed on ডিসেম্বর ৩০, ২০১৩ at ১২:২৯ পুর্বাহ্ন

    যথাযথ তথ্যসহ একটি সুলিখিত আর্টিকেল।

    সত্য বলা সহজ নয়। এর জন্য মূল্য দিতে হয় তা আমি মানি। দীর্ঘমেয়াদে জিততে বা টিকতে পারা যাবে কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন বটে। নয়তো সত্য বলার সব রকম চেষ্টাই পুরোপুরি মাঠে মারা যাবে। ইতিহাসেও জায়গা পাওয়া যাবে না। তাই না?

    তাই তাওয়া গরম থাকতে থাকতেই তাতে আঘাত করুন।

    আপনার তথ্যভিত্তিক আর্টিকেলের জন্য ধন্যবাদ মিজ আহমেদ।

  4. Aniket Sumon on ডিসেম্বর ২৯, ২০১৩ at ১১:৪৯ অপরাহ্ণ

    আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান নেতাকে নিয়ে লেখার জন্য শারমিন আহমদকে অভিনন্দন। একজন তাজউদ্দিন আহমদ না থাকলে বাংলাদেশ পেতাম না আমরা। আর এ জন্যই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে যদিও তিনি পঁচাত্তরের ৩ আগস্ট কোনো মন্ত্রিত্বে ছিলেন না।

    তাজউদ্দিন একজন দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশের একজন মহান প্রধানমন্ত্রী।

  5. ফরীদ আহমদ রেজা on ডিসেম্বর ২৯, ২০১৩ at ৫:৫৮ অপরাহ্ণ

    সত্যের জন্য যারা সংগ্রাম করেন তারা দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ দেখেন না। ওই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানও দেখেন না। সত্য বলেন তারা বিবেকের তাগিদে। মানুষ পরিচয়টির সার্থক প্রতিনিধি তারা হন জাগ্রত বিবেকের অনির্বাণ দ্যুতিতে। – চমৎকার! অনেক ধন্যবাদ।

  6. Biplab Talukder on ডিসেম্বর ২৯, ২০১৩ at ১০:৫৬ পুর্বাহ্ন

    খুউব ভালো একটি লেখা। বাংলাদেশ সম্পর্কে জানার জন্য এ্টুকুই যথেষ্ট।

    ধন্যবাদ।

[/message]