তাজউদ্দীন আহমদ ॥ বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম নেতা

[message type=”custom” width=”100%” start_color=”#FFFCB5″ end_color=”#d9ff80″ border=”#BBBBBB” color=”#333333″]
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
আজ ২৩ জুলাই। তাজউদ্দীন আহমদের জন্মদিন। এ বছর তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৫ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বর্তমান গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে। কালক্রমে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ এবং নেতারূপে। যুক্ত হলেন বাঙালী জাতিসত্তার আন্দোলনে, ঠিকানা পেয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সূচিত বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামে। সেই সংগ্রামকে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম বিশ্বসত্ম সহযোদ্ধা হিসেবে বেগবান করার ৰেত্রে অনবদ্য ভূমিকা রাখলেন তাজউদ্দীন আহমদ। অবশেষে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর চিনত্মার ধারক-বাহকে পরিণত হলেন তাজউদ্দীন আহমদ, মিলেমিশে একাকার হলেন তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুতে। ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। তখন কে, বঙ্গবন্ধু কে তাজউদ্দীন, কে সৈয়দ নজরম্নল, কে অন্য একজন_আলাদা করা যায়নি, হয়নি, প্রয়োজন ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে এঁদের সবার মাঝেই দেখা যেতে থাকে। ফলে বঙ্গবন্ধুকে ২৫ মার্চ গ্রেফতার করার পর তাজউদ্দীন সৈয়দ নজরম্নলসহ অন্য নামের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু নতুনভাবে আবিভর্ূত হচ্ছিলেন, ক্রিয়াশীল হলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে মুক্তিযুদ্ধে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হলো। সেই ঐতিহাসিক কালপর্বের হাল অত্যনত্ম শক্ত হাতে ধরে তাজউদ্দীন আহমদ প্রমাণ করলেন যে, তিনি বঙ্গবন্ধুর অবিচ্ছেদ্য নেতৃত্বের অংশ, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের একজন অবিভাজ্য নেতা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের ইতিহাস। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, আজ পর্যনত্ম আমরা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এমন বিশেষ চরিত্রকে যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারিনি। অথচ আমাদের শত্রম্নপৰ সেটি বুঝতে পেরেছিল বলেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর পরই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের অবিচ্ছেদ্য অংশ তাজউদ্দীন, সৈয়দ-নজরম্নল-মনসুর-আলী-কামারম্নজ্জামানদের হত্যা করতে খুব বেশি দেরি করেনি। রাষ্ট্রের স্থপতির সঙ্গে সহস্থপতিদের মূলোচ্ছেদের ষড়যন্ত্র উক্ত বিবেচনারই বিষয় ছিল। সুতরাং, ব্যক্তি তাজউদ্দীনের আলাদা সত্তার বাইরে রাজনৈতিক সত্তাটি কিন্তু মোটেও বিচ্ছিন্ন করে দেখার নয়। তিনি আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম একজন রূপকার, সংগঠক, নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক। এসব কিছুই তখন বঙ্গবন্ধুর বিশাল নেতৃত্বের নামে বা ছায়াতলে পরিচালিত হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমদ রাজনৈতিকভাবে তখন সেই নেতৃত্বের অন্যতম অংশ ছিলেন। এভাবেই বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন আহমদ ইতিহাসে একাকার হয়ে আছেন।
ব্যক্তি তাজউদ্দীন আহমদ আমার আপনার মতোই সাধারণ ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন। প্রতিটি শিশুই কিছু না কিছু স্বাতন্ত্রি্যক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে বেড়ে ওঠেন। তাজউদ্দীনের স্বাতন্ত্রি্যক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ছোটকাল থেকে তিনি প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে অতিক্রম করার স্বাৰর রেখেছেন। লেখাপড়ায় যত্নবান ছিলেন, প্রখর মেধার কারণে গুণী শিৰকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সৰম হন। উচ্চ মাধ্যমিক সত্মর পর্যনত্ম তিনি সেরা কৃতী ছাত্রদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন। এই ধারা অব্যাহত রেখে তিনি যদি শুধু লেখাপড়া করেই কর্মজীবনে প্রবেশ করতেন তাহলে হয়ত দেশের একজন মেধাবী শিৰক বা আমলারূপে প্রতিষ্ঠিত হতেন বা পরিচিতি পেতেন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে তিনি সেই পথে পরিচালিত করেননি, তিনি গড়ে তুলেছেন বৃহত্তর দেশ, সমাজ ও মানুষকেন্দ্রিক চিনত্মা-চেতনা থেকে। তখন যে ঐতিহাসিক বাসত্মবতার মধ্য দিয়ে আমাদের এই ভূখ- এবং জনগণ চলছিল সেটি ছিল পরাধীনতার যুগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ বিপর্যয়ের যুগ, স্বাধীন অসত্মিত্বকে জানান দেয়ার যুগ। তখনকার যে কোন মেধাবী তরম্নণের পৰে ঐতিহাসিক এসব ঢেউয়ে আন্দোলিত হওয়া ছাড়া খুব বেশি উপায় ছিল না। ১৩৫০-এর দুর্ভিৰ আমাদের তখনকার সমাজকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল, আবার কোন প্রকারে বেঁচে থাকা মানুষকে দুর্ভিৰ, মহাযুদ্ধ, পরাধীনতা ইত্যাদিকে ভেতর থেকে বোঝা এবং উপলব্ধি করার তাগিদ প্রদান করেছিল। তাজউদ্দীনের মতো মেধাবীদের অনেকেই এসবে আন্দোলিত হলেন। যাঁরা হননি ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের কেউ কেউ সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটিয়ে গেলেও ইতিহাসে তাঁদের নাম ওঠার সুযোগ ছিল না। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ আগা-গোড়াই সমাজ ও রাজনীতিসচেতন যুবক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। তিনি ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে যুক্ত হন, ১৯৪৪ সালে কাউন্সিলর নিযুক্ত হয়ে ১৯৪৫ সালে দিলস্নী সম্মেলনে অংশগ্রহণও করেন। অবিভক্ত ভারত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাজউদ্দীন অংশগ্রহণ করেন। সে কারণেই আমরা দেখতে পাই ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সঙ্গে সঙ্গেই তাজউদ্দীন আহমদ ভাষার অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামে একজন প্রগতিশীল যুবক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে শুরম্ন করেন। এভাবে যুবক তাজউদ্দীন তাঁর দেশকেন্দ্রিক, রাজনৈতিক চিনত্মার মানস গড়ে তুলতে থাকেন। ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতার ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরম্ন হলে তিনি তাতেও যুক্ত হন। জাতির সেই যুগসন্ধিৰণে একজন তরম্নণ রাজনৈতিক কমর্ী হিসেবে তাজউদ্দীনের অংশগ্রহণ ভবিষ্যত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার ৰেত্র প্রস্তুত করেছিল, তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক সত্তা গঠন করেছিল। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা পূর্ব-বাংলার জনগণের ভবিষ্যত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি সেই পর্বের একজন তরম্নণ সম্ভাবনাময় নেতা। সেখানেই শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা এবং উভয়ের এক সঙ্গে রাজনীতির নেতা হয়ে ওঠা, অভিন্ন রাজনৈতিক সত্তা নির্মাণ করা। ১৯৫৩-৫৭ সালে তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রণ্টের প্রাথর্ী হিসেবে জয়লাভ করেন। এসবই রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর উত্থানের এক ঐতিহাসিক পর্ব। তখনও তিনি অপেৰাকৃত তরম্নণ নেতা, উদীয়মান নেতা। তবে স্বীকার করতেই হবে মেধাবী, সৎ, আদর্শবান নেতা। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটানোর পেছনে বঙ্গবন্ধুসহ যাঁরা গুরম্নত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের নিউক্লিয়াসটি তখনই নতুনভাবে গঠিত হয়, যাত্রা শুরম্ন করে। তিনি আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদকও ঐ বছরই নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরম্নদ্ধে গণতন্ত্র পুনরম্নদ্ধার আন্দোলনের সক্রিয় কমর্ী এবং নেতারূপে তাজউদ্দীন কারাবরণও করেন। ১৯৬৪ সালে তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নতুন নেতৃত্ব, ধ্যান-জ্ঞান ও রাজনৈতিক চিনত্মায় আপোসহীনভাবে যাত্রা শুরম্ন করে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীনের নৈকট্য, ধ্যান-জ্ঞানের সমন্বয় আওয়ামী লীগকে অনেক বেশি পুষ্ট করতে থাকে। সেখান থেকে ৬-দফার জন্ম। বাঙালীকে মুক্তিদানের পথ সন্ধানে বঙ্গবন্ধুর ৬-দফার তাত্তি্বক রূপকার তাজউদ্দীনের মেধা ও চিনত্মার প্রকাশ ঘটেছে। ১৯৬৬ সালেই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। ইতিহাসের এমন পর্ব শুরম্নর পেছনে বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীনের একাত্ম হওয়াই পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করেছিল। দু’জনই রাজনীতির নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ১৯৬৬ সালে এসে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলেন, গোটা জাতিকে রাজনৈতিক গতিপথ রচনা এবং নির্দেশনা প্রদান করলেন। এই আন্দোলন, এই রাজনীতি খুব সরল-সহজ ছিল না, ছিল ইতিহাস নির্মাণের কঠিন এক সৃজনশীল প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের। বলা চলে তাত্তি্বক এবং সাংগঠনিকভাবে তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে সবকিছুর যোগান দিচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন দু’জনেই ঐ সময়ে জেলের বাসিন্দা হলেন, বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলায় মৃতু্যর মুখোমুখি দাঁড়ালেন। কিন্তু তাঁর আস্থা ছিল তাজউদ্দীনের প্রতি। তিনি অনত্মত জীবিত থাকলেও বাঙালীর মুক্তির সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। অবশেষে ১৯৬৯ সালে গণঅভু্যত্থানে পাকিসত্মানের সকল ষড়যন্ত্র সেই পর্বে নস্যাত হয়ে যায়। মুক্ত হয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন আহমদ। তাজউদ্দীনকে আগে জেল থেকে মুক্ত করার পরিকল্পনাও ছিল বঙ্গবন্ধুর। ১২ ফেব্রম্নয়ারি (১৯৬৯) তাজউদ্দীনের জেল থেকে মুক্ত হয়ে আসার পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। জনগণের অবিসংবাদিত নেতারূপে মুজিব মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুরূপে আবির্ভত হলেন। এই পর্বে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার মন্ত্রে জনগণকে উজ্জীবিত করার কার্যক্রমে দেশব্যাপী সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত করেন, তাজউদ্দীন তাঁর রাজনৈতিক চিনত্মাকে তাত্তি্বক ও সাংগঠনিকভাবে রূপ দিতে থাকেন। ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে প্রতিটি দিন পাকিসত্মানের শাসক মহলের সকল কূটকৌশলের জবাব রাজনৈতিকভাবে দিতে থাকেন তাজউদ্দীন আহমদ। বঙ্গবন্ধুর পরামর্শক্রমে তাজউদ্দীন আহমদের যুক্তি এবং কৌশলের কাছে পাকিসত্মানের শাসক গোষ্ঠী একে একে হার মানতে থাকে, বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন নতুনভাবে উদ্ভাসিত হতে থাকেন। তাজউদ্দীন তখন বঙ্গবন্ধুকে উর্ধে তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীনের মধ্যে আলাপ হতো, একে অপরকে রাজনৈতিক পথ রচনায় সাহায্য করতেন, দু’জনই যেন সম্পূরক, পরিপূরক হয়ে বাঙালীর মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে থাকেন।
৭ মার্চের ভাষণ যদিও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক বক্তৃতার এক অবিস্মরণীয় প্রতীক। এখানেও দু’জনের রাজনৈতিক চিনত্মার অনেক কিছুর সমন্বয় ঘটেছিল। ৭ মার্চ পরবতর্ী সময়ে তাজউদ্দীন অসহযোগ আন্দোলনের সাংগঠনিক দিক নির্দেশনা দেয়া, পত্রপত্রিকায় বিবৃতি প্রদান, পাকিসত্মানী শাসক গোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করাসহ সকল কাজ তাজউদ্দীন আহমদ সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করেছেন। তাজউদ্দীনের ওপর বঙ্গবন্ধুর আস্থার ভিত্তি ঐ দিনগুলোতে আরও গভীর এবং মজবুত হতে থাকে। তাজউদ্দীন তাঁর বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা এবং দৰতা দিয়ে পরিস্থিতিকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন তা ছিল অতুলনীয়। বঙ্গবন্ধুর পৰে এককভাবে তখন এতদিক ঠিক রেখে পাকিসত্মানের কূটকৌশলকে প্রতিহত করে মুক্তিযুদ্ধের দিকে গোটা জাতিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ_ যদি সে সময় তাজউদ্দীনের মতো এমন প্রজ্ঞা সহকমর্ী বঙ্গবন্ধুর পাশে না থাকতেন বলা কঠিন। বিশেষত ১৬ মার্চ থেকে যেসব বৈঠক ইয়াহিয়াসহ অন্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সেগুলোকে যৌক্তিক পর্যায়ে ধরে রাখা, পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব সহজ কাজ ছিল না। তাজউদ্দীন আহমদ সেই সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছায়ার মতো থেকে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ের পত্রপত্রিকা ও দলিল দসত্মাবেজে বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কর্মকা-, কর্মকৌশল, বক্তৃতা-বিবৃতি রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে তাজউদ্দীন আহমদ সকল রাজনৈতিক কর্মকা- ও কর্মসূচীকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত এবং সমর্থিত হিসেবেই নিয়ন্ত্রণ করেছেন, কোথাও নিজে বঙ্গবন্ধুকে ছাপিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেননি, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জটিল সেই পরিস্থিতিতে কোন ধরনের দ্বিমত বা প্রচ্ছন্ন দ্বন্দ্বের প্রকাশও ঘটাননি। বস্তুত তেমন কোন দ্বন্দ্ব বা দ্বিমতের সম্পর্ক তাদের দু’জনের মধ্যে তখন ছিল না। থাকলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কল্পনা সুদূরপরাহত হতো। দু’জন নেতা বা গোটা আওয়ামী লীগ তখন অভিন্ন লৰ্যে কেবলই এগিয়ে গিয়েছিল, একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাসত্মবতায় তখন জনগণকে নেতৃত্ব প্রদান করছিলেন। পঞ্চাশের দশকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীনের যে রাজনৈতিক নিউক্লিয়াস তৈরি হয়েছিল সেটি এই সময়ে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাফল্যের দ্বারপ্রানত্মে উপস্থিত হয়। সেই সম্ভাবনা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন আহমদ উভয়েই সচেতন ছিলেন, যত্নবান ছিলেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিসত্মান বাহিনী ঢাকা শহরে ট্যাঙ্ক ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গণহত্যায় নেমে যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যে ক’জনের সর্বশেষ দেখা হয়, কথা হয়, নির্দেশনা নিয়ে অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ পায় তাজউদ্দীন আহমদ তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আগেই কিছু কিছু নির্দেশনা পেয়েছিলেন, ঐ মুহূর্তেও শেষ নির্দেশনা নিয়ে পরবতর্ী কর্মযজ্ঞে অবতীর্ণ হলেন। এটি ছিল ইতিহাসের সবচাইতে কঠিন সময়। তাজউদ্দীন আহমদসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যন্ত্রণাকে বাসত্মবে রূপ দিতে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করাসহ হজারো সমস্যার মোকাবেলা সফলভাবে করতে সৰম হন। তাজউদ্দীন আহমদ প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে যে পর্ব শুরম্ন হয় তাতে বঙ্গবন্ধু সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু প্রতিটি কাজ, প্রতিটি বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি সার্বৰণিকভাবে বিদ্যমান ছিল। তাজউদ্দীন আহমদসহ অস্থায়ী সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ানত্ম লৰ্য হিসেবেই তুলে ধরেছিলেন। এখানেও বঙ্গবন্ধুকে সম্মুখে রেখেই কাজ করা হয়েছিল। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের কলাকৌশল উদ্ভাবন ও প্রয়োগে, প্রশাসন, কূটনীতিসহ সকল ৰেত্রে তাজউদ্দীন আহমদ যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন তার কোন তুলনা হয় না। তারপরও তাজউদ্দীন আহমদ এ সবকে তাঁর কৃতিত্ব হিসেবে নেননি, দেখেননি। তাজউদ্দীন আহমদ একজন দৰ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন তাই মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে সফল হতে সম্ভব করেছিল। কিন্তু তিনি এসবের পেছনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকেই বড় করে দেখেছেন। এখানেই তাঁর মহত্ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব এবং অমরত্ব। মুক্তিযুদ্ধকালে তাজউদ্দীন ত্যাগ, নিষ্ঠা, দৰতা, দেশপ্রেম ইত্যাদির যে স্বাৰর রেখেছেন তা ইতিহাসের বিরল ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা বাসত্মবে রূপ লাভ ঘটিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুর হাতে বিশ্বসত্মতার সঙ্গে তুলে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন আহমদ এক থেকে কাজ করতে পারেননি সেই ইতিহাস ভিন্ন, সেই ইতিহাস বেদনাদায়ক, সেই ইতিহাস আলাদাভাবে বিশেস্নষণযোগ্য। সেই প্রসঙ্গের বাইরেও বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীনের একাত্মের ফসল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই ইতিহাসের তুলনাই অতুলনীয়।
লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

[/message]payday loans direct lender only