এক মহীয়সী মায়ের স্মৃতি

[message type=”custom” width=”100%” start_color=”#FFFCB5″ end_color=”#d9ff80″ border=”#BBBBBB” color=”#333333″]

 

শারমিন আহমদ | আপডেট: ০০:১৯, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

Published in Prothom Alo

Chutir Dine Special Ed.

মেয়ে শারমিন আহমদের সঙ্গে মা জোহরা তাজউদ্দীন, ২৯ জুন, ২০১২ষাটের দশকের আদর্শবাদের সেই যুগে যখন আমার জন্ম হয়, তখন নিপীড়িতের দুয়ারে নতুন প্রত্যুষ এনে দেওয়ার স্বপ্ন ও অঙ্গীকারে জীবন উৎসর্গ করাটাই ছিল নেতৃত্বর সংজ্ঞা। আব্বু তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সেই শুদ্ধতম নেতৃত্বর প্রথম সারির একজন নেতা। তাঁর চিন্তা, লক্ষ্য ও কর্মের সঙ্গে একান্তভাবেই একাত্ম হয়েছিলাম আমরা চার ভাইবোন—আমি, রিমি, মিমি, সোহেল এবং আমার হূদয়ের কেন্দ্র আম্মা সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন।

১৯৫৯ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিতে আব্বু ও আম্মার প্রথম দেখা হয়। বিয়ে হয় ২৬ এপ্রিল। বিয়ের আগে আম্মা আব্বুকে বলেছিলেন, তিনি সোনার গয়না পছন্দ করেন না এবং বেলি ফুলের গয়না দিয়েই যেন বিয়ে হয়। আম্মার ইচ্ছা অনুযায়ী আব্বু নিয়ে আসেন বেলি ফুলের একরাশ গয়না, যা পরে আম্মা আব্বুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বর্ণ ও স্থূল বিত্তের সুকঠিন শৃঙ্খলে বাঁধা চেতনাহীন প্রথাকে আম্মা অতিক্রম করেন আত্মিক ঐশ্বর্যের অনির্বাণ দীপ্তি ছড়িয়ে।
আমি তাঁদের প্রথম সন্তান, আমার শৈশবের এক সিংহভাগ সময় আব্বু যখন জেলে কাটিয়েছেন, তখন ওনার স্বপ্ন ও কর্মের সার্থক প্রতিভূ হয়েছেন আম্মা। আম্মার কথা মনে হলেই মনে একই সঙ্গে ভেসে উঠেছে নানা ফুলের সম্ভারে আলোকিত ও সুরভিত নানা বর্ণের স্মৃতি। পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে হোমিওপ্যাথিতে ডিপ্লোমাধারী আম্মা ইট-বর্ণের টিনের বাক্সে থরে থরে সাজানো ওষুধভর্তি কাচের শিশি থেকে তুলে নিতেন সাদা গুঁড়ি গুঁড়ি আরনিকা নামের মহৌষধটি। ওষুধের মিষ্টি স্বাদ চাখতে চাখতেই আম্মার শাড়ির আঁচল থেকে নিতাম ওনার হাতের অতুলনীয় রান্নার সুবাস। আমার স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনটিতে আম্মা আমার মাথার মাঝখানে সাদা ফিতা দিয়ে সুন্দর ঝুঁটি বেঁধে দিলেন এবং পরম উৎসাহে আমার একরাশ ছবি তুললেন জাপানি ইয়াশিকা ক্যামেরা দিয়ে। ১৯৫৮ সালে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বিদেশ সফরের সময় আব্বু ক্যামেরাটি কিনলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জেলে থাকার দরুন আম্মাই ক্যামেরাটি ব্যবহার করতেন। স্কুল থেকে মাইল খানেক পথ হেঁটে বাড়িতে ফিরতেই প্রথম যাঁর দেখা পেতাম, তিনি বারান্দায় অধীরভাবে পায়চারিরত এবং অপেক্ষমাণ আম্মা। ১ জানুয়ারি ও প্রতি ঈদে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ ডিজাইনার আম্মার নিজ হাতে বানানো পোশাক পরতাম। আম্মার সেলাইয়ের মেশিনের ঘড়ঘড় শব্দ ও নেপথ্যে রেকর্ড প্লেয়ারে তাঁর প্রিয় হেমন্ত, সন্ধ্যা ও সতীনাথের গান শুনতে শুনতেই এক সময় আবিষ্কার করা শুরু করলাম এক অনন্য নারীকে।
আমার বয়স তখন সাত। স্কুল থেকে দরিদ্র তহবিলের আবেদনপত্র নিয়ে এলাম। ছয় দফার অন্যতম রূপকার আব্বু ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে আবারও জেলে বন্দী তখন। বাসাভাড়া দিয়ে কোনোমতে আম্মা সংসার চালাচ্ছেন। দরিদ্র তহবিলের আবেদনের জন্য উপযুক্ত আমি—এই ভেবে শিক্ষক আমার হাতে আবেদনপত্রটি ধরিয়ে দিলেন। আমি এটি আম্মাকে দিতেই তিনি তাতে একনজর চোখ বুলিয়ে দরাজ গলায় হেসে বললেন, ‘তোমার কি মনে হয় আমরা গরিব?’ আমি বললাম, ‘ঈদে আমরা এবার নতুন জামাকাপড় পরিনি। আব্বু জেলে। তাহলে তো আমরা গরিব। আমার ক্লাসের কজন মেয়ে আমাকে সে কথাই বলেছে।’ আম্মা বললেন, ‘শোন, নতুন কাপড় পরলেই কেউ ধনী হয়ে যায় না। যার যতটুকু রয়েছে, তার থেকে যে অকাতরে দান করতে পারে, সেই ধনী। তোমার আব্বু দেশের জন্য নিজের জীবনকে দান করেছেন। কজনের আব্বু অমন করে দান করতে পারে?’
আম্মার সব কথা বোঝার বয়স না হলেও তাঁর সেদিনের আত্মপ্রত্যয়ভরা গর্বিত উক্তিটি আমার শিশুমনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। অন্তরের ঐশ্বর্য যে বস্তু ও বিলাসসামগ্রী থেকে শ্রেষ্ঠ, তা তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। দেশ ও দশের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মহত্তম কর্মযজ্ঞে আব্বুর অসাধারণ অবস্থানটিও তিনি তুলে ধরলেন আমার পৃথিবীতে চলার উষালগ্নে।
১৯৭১ সালে চার নাবালক সন্তান নিয়ে আম্মা দুই মাস ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে, কোনোমতে প্রাণ নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মে মাসের শেষে কলকাতায় পৌঁছে ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী সাহেবের বাসায় ওঠেন। গভীর রাতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কান্ডারি স্বামী তাজউদ্দীন আহমদ সেখানে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য দেখা করতে এসেছিলেন। স্ত্রীকে বলেছিলেন, তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তিনি পারিবারিক জীবন যাপন করবেন না। কারণ, মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের পরিবার ছেড়ে যুদ্ধ করছেন। সুতরাং, তাঁদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওনাকেও যথাযোগ্য উদাহরণ রাখতে হবে। আব্বুর ওই সুকঠিন সিদ্ধান্ত শুনে আম্মার মনে কী অনুভূতি হয়েছিল, তা তিনি আমাকে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে (৩১ ডিসেম্বর, ১৯৯৩) প্রকাশ করেন। আম্মা বলেন, ‘ওই মুহূর্তগুলোতে এমন গৌরবমণ্ডিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে আমি প্রাণঢালা সমর্থন জানিয়েছিলাম। প্রত্যুত্তরের মাধ্যমে নয়। দারুণ শিহরণ জাগানো ঐকমত্য পোষণ করেছিলাম উদ্ভাসিত গভীর দৃষ্টিবিনিময়ের মাধ্যমে। তিনি বুঝেছিলেন। তারপর তিনি চলে গেলেন। সেই সময়কার সেই মহান সিদ্ধান্ত যেন হাজার বছরের অমূল্য উপাদান।’ এ-ই ছিলেন আম্মা, যিনি তাঁর আদর্শবাদী স্বামীর জন্য হাসিমুখে শুধু ত্যাগই স্বীকার করেননি, তিনি সেই আদর্শের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতেন বুকভরা গর্ব নিয়ে।
স্বামী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে জোহরা তাজউদ্দীন, ১৯৭৪বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ কামরুজ্জামানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পরে সর্বসম্মতিক্রমে এই আম্মার কাছেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ভার অর্পণ করা হয়েছিল। তিনি সেই একই আদর্শ ও ত্যাগের মশাল জ্বালিয়ে খাঁটি সেবকের রূপে দলের অন্যতম কান্ডারি হয়েছিলেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান আরোপিত বহু বাধা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, এমনকি সেই সময়ের রাস্তাঘাটবিহীন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত এলাকাগুলো ভ্রমণ করে, বিশেষত তৃণমূল কর্মী ও তরুণ প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে সেই সময় যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরা জানেন যে আম্মার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অসামান্য নীতিবোধ, নিরহংকার ও নির্লোভ মানসিকতা। নিজে কী পেলেন বা পেলেন না, তা নিয়ে তিনি কখনোই মাথা ঘামাতেন না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সুবিধাবাদী ও দলাদলির পঙ্কিল রাজনীতিতে তিনি সুস্থ ধারা নিয়ে আসার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। সে জন্য তাঁকে ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছিল এবং তাঁকে সুকৌশলে কোণঠাসা করা হয়েছিল।
নব্বইয়ের দশকে ওয়াশিংটন ডিসির জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে পলিটিক্যাল সাইকোলজি নামে একটি কোর্স পড়ানো হতো। রাজনীতির সঙ্গে মনস্তত্ত্ব যে নিবিড়ভাবে জড়িত এবং একজন রাজনীতিবিদের কর্মকাণ্ডকে বুঝতে হলে লোকচক্ষুর আড়ালের মুখোশহীন ব্যক্তিটির মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, ডেভেলপমেন্ট প্রভৃতিকে জানার যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তারই ওপর কোর্সটি হতো। আম্মার রাজনৈতিক নেতৃত্বে যে গুণাবলি পরিলক্ষিত হয়, সেগুলো ছিল তাঁর আজীবনের সাধনা। নিভৃতে নিজকে পরিশুদ্ধ করার মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের ফসল। নিষ্কলুষ রাজনীতিবিদ, দুর্দিনের কান্ডারি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহসভানেত্রী, নারী ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নিবেদিত কর্মী পরিচিতির ঊর্ধ্বে ছিল তাঁর এই সযত্নে লালিত সুচারু-সূক্ষ্ম মানবিক চেতনাবোধ। আম্মা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণীর সীমানা পেরিয়ে সবাইকে ভালোবাসতেন এমন উজাড় করে যে প্রত্যেকই ভাবত, আম্মা বুঝি তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। প্রেরণা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো কমতি ছিল না। আমার প্রথম প্রকাশিত শান্তি শিক্ষার দ্বিভাষিক বই হূদয়ে রংধনু (দ্য রেইনবো ইন অ্যা হার্ট), যা আম্মাকে উৎসর্গ করি, তা প্রকাশিত হয়েছিল আম্মারই ঐকান্তিক উৎসাহ ও প্রেরণায়। প্রকৃতিপ্রেমিক আম্মা বাগানের একটি ফুল ফোটা ও সুমিষ্ট বাতাসে গাছ ও পত্রপল্লবের তরঙ্গায়িত আন্দোলন দেখতেন কী এক অদ্ভুত একাগ্রতায়! কিশোর বয়সে আমাদের সামনে তিনি উন্মোচিত করেছিলেন চিন্তা ও প্রতিফলনের এমনই এক বিশাল জগৎ।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসে আমি যখন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) আম্মার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, তিনি তাঁর ডান হাতটি দিয়ে আমার হাত জড়িয়ে ধরলেন এমন মমতায় যেন কখনোই ছেড়ে যাবেন না। গলায় ঢোকানো খাদ্যর টিউব এবং নাক-মুখ চেপে বসা ব্রিদিং মেশিনের ভেতর থেকে কী আশ্চর্য রকমের জোর গলায় বললেন ‘গান গা’। হ্যাঁ, ওই প্রচণ্ড যাতনার মধ্যেও তিনি গান শুনতে চাইলেন। আমি আম্মার ধরা হাতখানিতে নিজেকে সমর্পণ করে চোখের পাতা ভিজিয়ে গাইলাম তাঁর প্রিয় কিছু গান। ‘আমার হূদয় তোমার আপন হাতের দোলে’, ‘কতবারও ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া’, ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে…’ গাইতে গাইতে দেখি আম্মা গানের সুরে সুরে তাল দিয়ে পায়ের পাতা নাচাচ্ছেন—ক্যানোলা লাগানো তাঁর বাঁ হাতসহ দুই হাতেই তাল দিচ্ছেন কী অবাক করা শক্তিতে! বেদনার কোটর থেকে বের করে আনছেন আনন্দের অমৃত ধারা।
ঠিক তার দুদিন পরেই (২০ ডিসেম্বর, ২০১৩) গভীর ভালোবাসার মানুষগুলোর চোখের সামনেই তাঁদের দোয়া ও প্রেমের সিঞ্চনে নিজেকে পরিবৃত্ত করে আম্মা চলে গেলেন অনন্তলোকের সেই আলোর জগতে। সঙ্গে নিয়ে গেলেন আমাদের হূদয়ের অনেকখানি।
ঢাকা, ১ জানুয়ারি, ২০১৪

[/message]