আমাকে ছোঁয়া যাবেনা লিলি

আকতার হোসেন
ছোট বেলায় একটা প্রশ্ন মাথায় ভেতর বেশ ঘুরপাক খেত। নায়ক কাকে বলে! কাকে জিজ্ঞেস করি কাকে জিজ্ঞেস করি ভাবতে ভাবতে একদিন সব জান্তা ছিরু কাকাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যাকে দেখতে সকলে ব্যাকুল থাকে তিনিই হলেন নায়ক। উত্তর সঠিক ছিল কিনা বুঝতে না পেরেও ছিরু কাকার উপর সন্তষ্ট হয়েছিলাম। এখনতো আমি নিজ হাতেই নায়ক তৈরি করে মানুষের সম্মুখে নিয়ে আছি। আমার নায়কেরা তাই করে আমি যা করতে বলি তাদের। মাঝে মাঝে লম্ফ ঝম্পের মতো সব অসাধ্য কাজ করে দেখাতে বলি নয়কদের।তবে, সেগুলো সব কলম দিয়ে গড়া নায়ক। কদিন যেতেই নিজ হাতে গড়া নায়কের দিকে আর চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না। একটা শুনত্যার ভেতর যেন বাস করে তারা। তখন ছিরু কাকার কথা আবার মনে পড়ে যায়। নায়ক হলেন তিনি যাকে দেখতে সকলে ব্যকুল হয়ে থাকে।
আমরা যারা নিজ হাতে নায়ক তৈরি করি তাদের মাথায় চলে নানান বুদ্ধির খেলা। কখনো নায়ককে পাঁচ তলা ছাদের উপর থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যেতে বলি। কখনো নায়কের উপর নির্দেশ থাকে ঝড়ের রাতে নায়িকাকে নিয়ে নদী পার হয়ে যেতে। আবার সুযোগ বুঝে নায়ককে ঘোড়ার উপর বসিয়ে বলি রক্তগঙ্গা ভাসিয়ে দিতে। যে যেভাবেই তৈরি করি না কেন কলমের ঘুরপাকে পড়ে বেচারা নায়কের নিজস্ব রুপ আর বের হতে পারে না।
ধরুন একজন দেশ প্রেমিক যোদ্ধার কথা। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে যিনি সংসারের সকলকে ছেড়ে গোপন আস্থানায় বসে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। দিন নেই রাত নেই, তাঁর শুধু একটাই চিন্তা দেশটা স্বাধীন হবে কবে । দেশের কাজে ফেলে আসা স্ত্রী আর সন্তানদের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল বিচ্ছিন। যুদ্ধ নিয়ে এতোটাই পাগলামি ছিল যে সংসারের দিকে তাকানোর সময় ছিল না। এদিকে তাঁর জীবন সাথী চারটি সন্তানকে নিয়ে অতি গোপনে সীমান্ত পারি দিয়ে চলে এলেন নিরাপদ স্থান বলে খ্যাত শহর, কোলকাতা। সে সব দিনে নারী পুরুষ কেউ নিরাপদ ছিল না। প্রতিদিন হাজারের উপর লোককে গুলি করে হত্যা করা হতো। এমনি অবস্থায় একজন নারী শত্রুসেনাদের চোখকে ফাকি দিয়ে দিনের পর দিন ক্লান্ত শরীরে পথ চলে এসেও প্রথমে খোঁজ করলেন তার প্রিয়তম স্বামীকে। কোলকাতায় এসে তিনি যেন নুতুন করে প্রান ফিরে পেলেন। আর সেই উদ্দীপনায় খুঁজতে লাগলেন যুদ্ধরত জীবন সাথীকে। খবরটি পেতে দেরি হয়নি তাঁর স্বামীর । সংবাদ শুনে তিনি সংক্ষেপে বললেন আমি একটা ব্যবস্থা করে রাতে এসে দেখা করে যাব।
রাত কি আর শেষ হতে চায়। শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আসতে যতো না শরীর ভারী হয়েছিল তার থেকে ভারী হতে লাগল অপেক্ষার প্রতিটি ক্ষন। কতোদিন হয়ে গেল ছেলে মেয়রা তাদের বাবাকে দেখে না। বাবা বাবা বলে চিত্কার করে না। তাঁর চশমার কাচটি হয়তো কেউ পরিস্কার করে দেয়নি এতোদিন। জগতের সব কথা জমা করতে করতে একসময় তাঁর ক্লান্ত দেহকে ঢেকে দিল ঘুমের চাদর। ছেলে মেয়েরা ঘুমিয়ে গিয়েছিল তারো অনেক আগে। কিন্তু তখনো যিনি জেগে ছিলেন তিনি হলেন পরিবারটির আশ্রয়দাতা। প্রচন্ড শ্রদ্ধা ও ভালবাসা ছিল লোকটির হদয় জুড়ে। মাঝরাতে আসবার কথা যিনি দিয়েছেন তিনি যেভাবেই হোক একবার আসবেন। তিনি এসে যদি দেখেন সকলে ঘুমিয়ে পরেছে তাহলে এই মধুর মিলনের কি হবে। সত্যি সত্যি মধ্যরাতে এসে উপস্থিত হলেন তিনি। সামান্য কিছু খোঁজ খবর নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলেন দোতালা সিঁড়ি বেয়ে। কিছুটা দুরত্ব রেখে ঠিক তার আগে আগে এগিয়ে চলছেন সেই আশ্রয়দাতা। একসময় খুব সাবধানে দরজার কড়া নাড়লেন তিনি। ভেতর থেকে প্রশ্নে কে? জবাব দিতে গিয়ে আশ্রয়দাতাকে বলতে হলো স্যার এসে গেছেন। আর কি বিলম্ব সাজে, ততক্ষণাৎ দরজা খুলে বের হয়ে স্ত্রী দেখেন আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্যে তাঁর স্বামী সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে আসছেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম ও চিন্তার একটি ছাপ তাঁর মুখের উপর দাগ কেটে বসে আসে। বেশ লম্বা একটা বারান্দা। সেই বারন্দায় পা দিয়ে তিনি হোসেন আলিকে ইশারা দিয়ে আড়ালে যেতে বললেন। আর কেউ নেই সেখানে। মাত্র একজোড়া নর নারী। দুজনের মধ্যে দুরত্ব মাত্র কয়েক হাত।

এখন আপনারাই বলুল এই অবস্থায় একজন চিত্রকর, নাট্যকার কিংবা উপন্যাসিকের করণীয় কি? তিনি কি প্রচন্ড একটা গতি সৃষ্টি করে নিবিড় আলিঙ্গনের উষ্ণতা দিয়ে ওই দুজন নর নারীকে জড়িয়ে দিবেন না। সমুদ্র থেকে পানি উঠিয়ে এনে তাদেরকে না ভিজিয়ে ছেড়ে দিবেন ভাবছেন। এমন একটি দৃশ্যে অন্ধকার আকাশ থেকে কি লাফিয়ে এসে এক ফালি বিদুত্ৎ হেসে উঠবে না দুজনের চোখে মুখে। যে কোন গল্পকারে কাছে সেটাই স্বাভাবিক আচরন হবার কথা। অথচ বাস্তবতা হলো তেমন কিছুই হয়নি তখন। দৃশ্যটি ছিল অতী সাদা মাটা। লম্বা বারান্দা পার হয়ে স্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর আগেই চলা থামিয়ে দিলেন মাঝ রাতে আসা সৈনিক। এদিকে ফেলে আস দু’মাসের ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলি যেভাবে স্বামীকে শোনাবেন বলে একটা ছক করে রেখেছিলেন সেই গৃহবধু, দুর্দান্ত শক্ত মনোবল দিয়ে তার গর্বিত স্বামী সেই ছক বদলিয়ে দিলেন নিজের মত করে। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি বললেন; আমাকে ছোঁয়া যাবেনা লিলি। খুব জরুরি কিছু কথা বলবো বলে এসেছি। চল ঘরের ভেতরে চলো।
ঘরে ঢুকে তিনি ঘুমন্ত সন্তান্দের আদর করলেন। তারপর বাংলার সেই নির্ভীক সৈনিক বললেন, তোমার এই দোলনচাঁপা এখন সাড়ে সাতকোটি মানুষের ঘরের ঠিকানা। এখন আমার নির্দিষ্ট কোনো ঘর নেই। ছয় সাত মিনিট সময় হাতে নিয়ে এসেছি। আমরা ক’জন শপথ নিয়েছি দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত গৃহস্থ জীবনে আর ফিরে যাব না। সেই শপথে আমরা স্বাক্ষর করে সীল মোহর লাগিয়ে দিয়েছি। এ ব্যাপারে আমি তোমার সাহায্য চাই।
স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে তিনি আরো বললেন, থাকা খাওয়া নিয়ে কোন চিন্তা করবে না। তোমার স্বামী বাংলাদেশের অস্থায়ি সরকারের প্রধানমন্ত্রি হবার জন্য নয়, ভারতের কেন্দ্রিয় সরকার সাধ্য মত চেষ্টা করে যাচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে তারা থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবে। হোসেন আলী পাকিস্তান সরকারে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ইতিহাসে ওর নাম লেখা থাকবে সন্মানের সাথে। সে এখন বাংলাদেশ সরকারে পররাস্ট্র মন্ত্রনায়ের অধীনে চাকুরিরত। আর আমি সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রি। তাই নিয়মনীতির কারনে এখানে থাকাতে তোমাদের একটা বাধা আছে। আমি ব্যবস্থা করে যত শ্রীঘ্র সম্ভব তোমাদের এখান থেকে নিয়ে যাবো।
উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রি তাজউদ্দিনের ছদ্ম নাম ছিল দোলনচাঁপা আর তাঁর স্ত্রী জ়োহরা তাজউদ্দিনের ডাক নাম লিলি। আপনারা হয়তো এখন লেখকের অতৃপ্তিটুকু বুঝতে পারছেন। বারান্দার খোলা দরজার পাশে গভীর রাতের দৃশ্যটি আমার মনের মত করে সাজাতে না পারা একজন লেখক জন্য পরাজয় নয় কি। আর সেই পরাজয়ের কারন হলো এখানে নায়ক একজন বাস্তব নায়ক। যিনি কলমের খোঁচায় জন্ম নেন নি। বরং হালে নিরন্তর তাঁর জীবন ছূঁতে চায় হাজারো কলম। অসংখ্য নায়ক তৈরী করার অদম্য বাসনা ছিল আমার। অথচ কলমের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে গেল একটি সত্য খটনার কাছে। একজন লেখক যে শুধু নায়কের পর নায়ক সৃষ্টি করে যাবে সে কথা মোটেও ঠিক নয়। কিছু কিছু নায়কও আছেন যারা মাঝে মাঝে লেখক তৈরী করে বসেন। যেমন আমাদের প্রান প্রিয় নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ তাদেরই একজন।
রুপকথা কিংবা উপন্যাসের কোন কাহিনী নয়, নয় চলচিত্রের কোন চরিত্র। অথচ তাজউদ্দিন আহমেদের কথা শুনে হয়তো মনে হতে পারে সেরকম কিছু। আমাদের মধ্যে কতজন লোক আছেন যার জানেন যে একজন প্রধানমন্ত্রি হয়েও তিনি নিজ হাতে কাপড় কেচে পরতেন। যুদ্ধের সময় তাঁর ব্যস্ততা এতো বেশি ছিল যে তিনি নিজ হাতে যখন কাপর কাচতেন তখন পাশে জল চকিতে বসে তার সচিব প্রয়োজনীয় নোট নিত। একদিন তাঁর পিয়নের অনুপুস্থিতির কারন অনুসন্ধান করে যখন জানতে পারলেন প্রচন্ড জ্বরের কারনে সেদিন সেই পিয়ন অফিসে আসতে পারেনি। তারপর বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রিকে আবিস্কার করা গেল নিজ হাতে অসুস্থ পিওনের মাথায় বদনা দিয়ে পানি ঢালতে।
আমাদের অনেকে বড় ভাগ্য যে একজন অসাধারন নেতা আমাদের মহা বিপদকালিন সময়ে হাল ধরে পার করে দিয়েছিলেন ছোট্র একটি তরী। যে তরিতে ঠাই নিয়েছিল সর্বসাকুল্যে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে অবাক হয়ে যাই আমরা কি করে ভুলে গেলাম তাঁকে। আর একটি কথা ঘটনা বলি। একদিন তাজউদ্দিন আহমেদেকে এক নজর দেখার জন্য তার সন্তনেরা একজোট হয়ে এলিভেটের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। কেননা তার ঘবর পেয়েছিল যে তাদের বাবা সরকারী কাজে দেখা করতে এসেছেন একই বিল্ডিং এ বাস করা মাননীয় অস্থায়ি রাস্ট্রপতির সাথে। অনেক অপেক্ষার পর যখন তাদের বাবাকে দেখা গেল দরজা খুলে বেড়িয়ে আসতে তখন তিনি হাত দুলিয়ে মিস্টি হেসে চলে গিয়েছিলেন ওদের কাছে না এসে। পাছে, সংসারের মায়াজালে আটকে গিয়ে তিনি তার মহান কর্ত্যবকে অবহেলা করে বসেন শুধু এই কথাটুকু ভেবে। এমনই একজন রাস্ট্রনায়ক ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ যিনি তাঁর প্রধানমন্ত্রির দপ্তরে নিজের চেয়ারের পাশে অন্য একটি চেয়ার বসিয়ে সেখানে প্রান প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর একটা ছবি রেখে কাজ করতে। দেয়ালে ছবি ঝুলানো খুব সহজ কাজ কিন্ত উপযুক্ত মর্যদা নির্ধারন করতে হয়তো সকলে পারে না। এমন উপলব্ধি জাগাতে হলে আমাদের হয়তো তাজউদ্দিনের মত মানুষদের কাছেই ঘুরে ফিরে আসতে হবে। হতাশ হয়ে যাই এই ভেবে, কি করে আমরা নিঃশ্চুপ বসে থাকতে পারলাম এমন কাহিনী দেশ বিদেশের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে না দিয়ে। আর কি করেই বা পারলাম আমদের দেশের ছেলে মেয়েদের পাঠ্য পুস্তকে আজে বাজে সব গল্প জুড়ে দিতে।
এই মহান মানুষটির কিছু কথা হয়তো জানা যাবে YouTube এ দশ পর্বে আপলোড করা Tajuddin Ahmed – An Unsung Hero দেখতে পারলে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে চৌদ্দ পনের কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীদের মধ্যে মাত্র দুইশ জন লোকও পাওয়া গেল না যাদের হাতে দশ পর্বের ডকুমেন্টারি পুরোটা দেখার সময় আছে। তানভির মোকাম্মেলের বানানো আসল তথ্যচিত্রটি কতজন দেখেছে কে জানে সে কথা। আর তাজউদ্দিন আহমেদের উপর লেখা বিভিন্ন বই পুস্তক আমাদের মধ্যে কে কতটুকু পড়েছি? বোধকরি সে জন্য তাঁর সম্পর্কে ডঃ মীজান রহমান মন্তব্য করেছেন “A Great Leader We Didn’t Know We Had.”
ভাবছি ইউটিউবে আপলোড করা আমার নাটকগুলো সব নামিয়ে ফেলবো।